রবিবার, আগস্ট ২৩, ২০২৬

কৃষিঋণ নিতে প্রান্তিক কৃষকের আগ্রহ কমছে, এনজিও থেকে ঋণ নেওয়া হচ্ছে বেশি, শোধ দিতে না পারায় বাড়ছে আত্মহত্যা

WP Import ২৭ আগস্ট ২০২৫ ১২:৫৪ পূর্বাহ্ন
WP Import ২৭ আগস্ট ২০২৫ ১২:৫৪ পূর্বাহ্ন
কৃষিঋণ নিতে প্রান্তিক কৃষকের আগ্রহ কমছে, এনজিও থেকে ঋণ নেওয়া হচ্ছে বেশি, শোধ দিতে না পারায় বাড়ছে আত্মহত্যা
কৃষিঋণ নিতে প্রান্তিক কৃষকের আগ্রহ কমছে, এনজিও থেকে ঋণ নেওয়া হচ্ছে বেশি, শোধ দিতে না পারায় বাড়ছে আত্মহত্যা

নিজস্ব প্রতিবেদক:


রাজশাহীতে এনজিও এবং সুদের কারবারিদের থেকে ঋণ নেওয়ার স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন ঋণগ্রহীতারা। ঋণের বৃত্তে আটকাও পড়ছেন জেলার নি¤œআয়ের হাজার হাজার মানুষ। উচ্চসুদে নেওয়া ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের কথা থাকলেও তা না করে সাংসারিক প্রয়োজনে ব্যয় করছেন। ফলে, তারা এখন সেই ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে না পেরে পড়ছেন বেকায়দায়। এনজিওগুলোর মাঠকর্মীরাও প্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়া তাদের টার্গেট পূরণে যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ দিচ্ছে আগ্রাসীভাবে।

ঋণ পরিশোধে এনজিও এবং সুদ কারবারিদের অব্যাহত চাপের মুখে ঋণগ্রস্তরা কোনো দিশা খুঁজে পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে তাদের অনেকেই এখন এলাকাছাড়া। এমনকি অভাবের তাড়নায় কেউ কেউ হতাশ হয়ে বেছে নিচ্ছে আত্মহননের পথ। চক্রবৃদ্ধির ঋণের দুঃসহ দুষ্টচক্রে আটকা পড়ে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। চলতি মাসে শুধু রাজশাহী অঞ্চলেই মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে ঋণের চাপে অন্তত ১১ জনের আত্মহত্যার খবর প্রকাশ হয়েছে গণমাধ্যমে। আত্মহননের পথ বেছে নেওয়ার আগে অনেকেই জানিয়ে গেছেন, ঋণের বোঝা বইতে না পেরে, অপমান আর অনাহারের কষ্ট সইতে না পেরে- পৃথিবীকে বিদায় বলেছেন তারা। আবার কেউবা আত্মহত্যা ‘মহাপাপ’ ভেবে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন অজানার উদ্দেশ্যে।

আবার ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালাতে সরকারের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির অনুমতি লাগলেও বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠান সেই বাধ্যবাধকতা মানছে না। জেলা সমাজসেবা অধিদফতরের উপপরিচালক মনিরা খাতুন বলেন, ‘রাজশাহীতে ১ হাজারেরও বেশি সংস্থা নিবন্ধিত, তবে এদের মধ্যে কোনগুলো ক্ষুদ্রঋণ চালায়, সে তথ্য আমাদের নেই।’
১৫ আগস্ট রাতে জেলার পবা উপজেলার বামনশিকড় গ্রামের মিনারুল ইসলাম (৩৫) ঘরে বসে লেখেন জীবনের শেষ চিঠি। যাতে উল্লেখ করেন ঋণের চাপ আর পরিবারের অভাবের কথা। তারপর স্ত্রী মনিরা, ছেলে মাহিম ও দেড় বছরের ছোট্ট কন্যাসন্তান মিথিলাকে হত্যা করে নিজেও গলায় ফাঁস দেন।

মিনারুলের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ১৮ আগস্ট সকালে মোহনপুর উপজেলার খাড়ইল গ্রামে পাওয়া যায় কৃষক আকবর শাহের ঝুলন্ত মরদেহ। তার বাড়িতে মিলেছে ১৪টি এনজিওর পাস বই। প্রতি সপ্তাহে কিস্তি দিতে হতো প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। শোধ করতে না পেরে মানসিক চাপে নিজের পানবরজে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। এর আগে গত ১৪ আগস্ট, একই উপজেলার ফজলুর রহমান নামের এক রিকশাচালককে সুদের কারবারিদের হাতে নির্যাতনের পর ঘাস মারা বিষ খাইয়ে ফেলে রাখার অভিযোগে মামলা করা হয়। পরে হাসপাতালে মৃত্যু হয় তার। একইভাবে ঋণের বোঝা টানতে না পেরে আত্মহুতি দেন অটোরিকশাচালক শামসুদ্দিন, কৃষক রেন্টু পাইক, নাটোরের রউফুল ইসলাম দম্পতি এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের যুবক নূর মোহাম্মদ।

মানবাধিকার সংগঠন বরেন্দ্র উন্নয়ন প্রচেষ্টার পরিচালক ফয়জুল্লাহ চৌধুরী তৃণমূলে তার কাজের অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, ‘এ অঞ্চলে যারা ঋণ নেন, তাদের বেশিরভাগই কৃষির জন্য নেন; কিন্তু উৎপাদন শুরু হওয়ার আগেই সাপ্তাহিক কিস্তি দিতে হয়। ফলে প্রকৃত সুদের হার দাঁড়ায় ৩০ শতাংশেরও বেশি। ঋণ শোধে ব্যর্থ হলেই শুরু হয় মানসিক নিপীড়ন। একসময় অনেকেই আত্মহননের পথ বেছে নেন। আবার কেউ বা অজানার পথে পা বাড়ান।’

বরেন্দ্র অঞ্চলখ্যাত রাজশাহীর তানোরের পাচন্দর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত জনপদ চিমনা গ্রামের আব্দুল হাই লাভলু। গত দেড় বছরে বেশ কয়েকটি এনজিও থেকে স্ত্রী, মা ও বোনের নামে নেন সাড়ে ৫ লাখ টাকার ঋণ, যা দিয়ে অন্য ফসলের চেয়ে বেশি দামের আশায় ৩০ বিঘা জমিতে করেন আলুর আবাদ; কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি, উৎপাদন খরচের চেয়ে আলুর দাম পান অর্ধেকেরও কম। ফলে দফায় দফায় সময় নিয়েও এনজিওর ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছিলেন। কয়েকটি এনজিওর মাঠকর্মীরা টাকা আদায়ে দিন নেই, রাত নেই হাজির হচ্ছিলেন বাড়িতে। এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে দুই মাস আগে দুই ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি থেকে পালান লাভলু। এখন সেই ঋণের বোঝা চেপেছে তার মা নাসরিন বানুর কাঁধে। প্রতিদিনই এনজিও থেকে লোকজন এসে লাভলুকে না পেয়ে ঋণ পরিশোধে চাপ দিচ্ছে তার মাকে। নাসরিন বানু বলেন, ‘ছেলে পালিয়েছে। এখন সেই ঋণের চাপ আমার ওপর পড়েছে। প্রতিদিন লোকজন এসে টাকা চায়। যদিও কোনো কোনো এনজিওর ৫০ শতাংশ ঋণ পরিশোধও হয়েছে; কিন্তু তারপরও তারা সুদ আরও বাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। যা দেখছি, মরণ ছাড়া কোনো উপায় নেই।’

শুধু লাভলুই নয়- একইভাবে উপজেলার তালোন্দ ইউনিয়নের নারায়ণপুর গ্রামের রবিউল ইসলাম মোংলা, শহিদুল ইসলাম, লুৎফর রহমান মরু, এনামুলসহ অনেকেই ঋণের বোঝা বহন করতে না পেরে পালিয়ে ঢাকায় চলে গেছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই দুটি ইউনিয়ন ছাড়াও উপজেলার অন্য ইউনিয়নগুলোর গ্রামের চিত্র প্রায় একই রকম। তানোরের ৮৫-৯০ শতাংশ মানুষই চাষাবাদসহ বিভিন্ন কারণে ঋণ নিয়ে এখন অসহায় অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন।

শুধু আত্মহত্যাই নয়, ঋণের চাপে অনেক পরিবার রাতারাতি বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে গেছে। জানা গেছে, রাজশাহীর পুঠিয়ার নামাজগ্রাম এলাকার গাইন কালাম ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে বছর দুয়েক আগে ভিটেমাটি বিক্রি করে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছেন। আজও তার খোঁজ মেলেনি বলে জানিয়েছেন এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নি¤œআয়ের মানুষদের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হচ্ছে। তারা যে টাকা আয় করছেন তাতে সংসার চলছে না। ফলে অন্য মাধ্যমে বাড়তি আয়ের আশায় বিভিন্ন এনজিও ও সুদ কারবারিদের থেকে ঋণ নিচ্ছেন। আবার অনেকেই এনজিওর মাঠকর্মীদের ফাঁদে পড়ে কোনো কিছু না বুঝেই ঋণ নিচ্ছেন। কেউ বা মাদক কিংবা নেশার টাকা জোগাতেও এনজিও ও সুদের কারবারিদের থেকে নিচ্ছেন ঋণ।
পবা উপজেলার দারুশা এলাকার আব্দুল হাই ব্যক্তি বলেন, ‘স্ত্রী-সন্তানসহ ৬ সদস্যের পরিবার আমার। চালাই রিকশা; কিন্তু এই টাকা দিয়ে সংসার চলে না। বাধ্য হয়ে এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে একটি গরু কিনেছিলাম; কিন্তু সেই গরু লালন-পালন করতে গিয়ে ধরা খেয়েছি। গোখাদ্যের দামও অনেক। আবার সপ্তাহে সপ্তাহে কিস্তি দিতে হচ্ছে। ফলে রিকশা চালিয়ে সংসার চালাব, গরুকে খাওয়াব নাকি ঋণ পরিশোধ করব? এখন জীবন বাঁচানোই দায় হয়ে পড়েছে।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) ও অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদ খান বলেন, ‘এনজিও কর্মীদের ওপর থাকে ঋণ বিতরণের চাপ। চাকরি টিকিয়ে রাখতে তারা যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ দেন। অন্যদিকে ঋণগ্রহীতারা টাকার সঠিক ব্যবহার করতে পারেন না। ফলে দুষ্টচক্রে পড়ে নিঃস্ব হন তারা।’
সংবাদ সংস্থা ইউএনবির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বেসরকারি দেশীয় ব্যাংকের মধ্যেও ঋণ প্রদানের পরিমাণ কমেছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকেও ঋণ প্রদানের পরিমাণ অন্যান্য সময়ের তুলনায় কম ছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক উইংয়ের সর্বশেষ মে মাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের সঙ্গে তুলনা করলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকে কৃষি ঋণ প্রদানের পরিমাণ কমেছে ১১.৩৫%।
বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে এই ঋণ প্রদানের পরিমাণ কমেছে ৯.৭৪% এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকে তা কমেছে ০.৩০%। এই তিন ক্যাটাগরির ব্যাংকের অধীনে লক্ষমাত্রা অনুসারে ২৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ঋণ প্রদানের কথা থাকলেও সবচেয়ে কম ঋণ দিয়েছে এসব ব্যাংকই।

অন্যান্য বছরগুলোতে কৃষি ঋণের লক্ষমাত্রা ছাড়িয়ে গেলেও সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে লক্ষমাত্রার তুলনায় ঋণ প্রদান কমে আসার কারণ অনুসন্ধান করে দেখা যায়, ক্ষুদ্র কৃষক, প্রান্তিক চাষি এবং নতুন উদ্যোক্তাদের মধ্যে কৃষি ঋণ গ্রহণের প্রবণতা কমেছে। বিশেষত আশপাশের যারা কৃষি ঋণ নিয়েছেন, তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন বাকিরা। তবে এনজিও ও সুদ কারবারিদের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া সহজ হওয়ায় তারা এদিকে বেশি ঝুঁকছেন।
চলতি অর্থবছরের জন্য কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালা এবং কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যেখানে গত বছরের চেয়ে এ বছর ঋণের পরিমাণ নতুন করে ১,০০০ কোটি টাকা বাড়ানো হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরের লক্ষমাত্রা পূরণ হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যার বিপরীতে ঋণ প্রদান করা হয়েছে ৩৭ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ, লক্ষমাত্রার তুলনায় ঋণ প্রদান কম ৬৭৪ কোটি টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংক, দুইটি বিশেষায়িত ব্যাংক, ৪২টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আটটি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ করেছে, যা মোট লক্ষমাত্রার ৯৮.২৩%। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কৃষি ঋণের লক্ষমাত্রা ছিল ৩৫ হাজার কোটি টাকা, বিপরীতে ঋণ প্রদান করা হয়েছে ৩৭ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা, যা ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় ৪ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা বেশি।

অন্যদিকে, দুই বিশেষায়িত ব্যাংকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ঋণ প্রদানের পরিমাণ বেড়েছে ১১.৬৯ শতাংশ। যেখানে বিশেষায়িত ব্যাংকের অধীনে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
এদিকে, ঋণ প্রদান কমলেও বেড়েছে ঋণ আদায়ের পরিমাণ। মে মাসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২০২৩-২৪-এর তুলনায় ঋণ আদায় বেড়েছে ৪.৬৮%। সবচেয়ে বেশি ঋণ আদায় বেড়েছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে, ৮.৭৬%; যাদের হাতে ঋণ প্রদানের লক্ষমাত্রা ২৪ হাজার ১২১ কোটি টাকা।

অর্থাৎ, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ঋণ কম দিলেও আদায়ের ক্ষেত্রে এগিয়ে ছিল এবং এটিই কৃষকদের ওপর চাপ বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ মাঠ সংশ্লিষ্টদের।
ঋণের চাপে আত্মহত্যার বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মোহা. এনামুল হক বলেন, ‘দেশে দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। বিশেষ করে নির্বাচিত সরকার না থাকার কারণে গত এক বছরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ পরিবারের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিতে পারছে না। আবার, একটা শ্রেণি তাদের আখের গোছাচ্ছে; কিন্তু সাধারণ মানুষ অভাবের তাড়নায় ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে। সেক্ষেত্রে কঠিন শর্ত ও পারসেন্টেন্স দেওয়ার ভয়ে ব্যাংকের পরিবর্তে উচ্চ সুদেও এনজিওর দারস্ত হচ্ছে তারা। এতে ঋণ শোধ করতে না পেরে বিপথগামী হচ্ছেন তারা।’

এনজিও থেকে ঋণ নেওয়ার যে প্রবণতা তা দীর্ঘদিনের বলে উল্লেখ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. এ এন কে নোমান। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে গ্রামাঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষ ঋণ ভোগের জন্য নিয়ে থাকে। ফলে এখান থেকে রিটার্ন আসে না। আবার এই সুদভিত্তিক ঋণের ফলে এক সময় তা অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। যখন সময় মতো কিস্তি দিতে না পারে তখন সেই ভোক্তা সামাজিক, মানসিকভাবে নিগৃহীত হয়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আরেক জায়গা থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। ফলে এই ঋণ এবং সুদ চক্রবৃদ্ধিহারে তাকে ঘিরে ধরে। আমাদের দেশে যে সমস্ত এনজিও বা সংস্থার যে ঋণ ব্যবস্থা এটা এক ধরনের শোষণের জায়গা।’

তিনি আরও বলেন, ‘সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা বলে অনেকে ব্যক্তি পর্যায়েও ঋণ বা মহাজনি কারবার চালায়। এ বিষয়গুলো থেকে বেরিয়ে আসতে গোটা ব্যবস্থার সংস্কার দরকার; কিন্তু বাংলাদেশ এখন যে অবস্থায় আছে, সেখান থেকে ভোক্তা পর্যায়ে এই ব্যবস্থাগুলো সংস্কার করা বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ফলে এই যে আত্মহত্যা বা এ ধরনের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক্ষেত্রে ব্যক্তি পর্যায়ে আমাদের সচেতন হতে হবে। সুদভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থার বিকল্প খুঁজতে হবে।’
সার্বিক বিষয়ে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ ইয়াকুব হোসেন বলেন, ‘যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ দেওয়া উচিত নয়। টাকা যেন সঠিক খাতে ব্যবহৃত হয়, সে বিষয়েও এনজিওগুলোকে নজর দিতে হবে।’