শুক্রবার, আগস্ট ২৮, ২০২৬

চাঁপাইনবাবগঞ্জে গান-বাজনা নিষিদ্ধের নোটিশ, প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার!

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ০৭ মার্চ ২০২৬ ১০:৩৭ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ০৭ মার্চ ২০২৬ ১০:৩৭ অপরাহ্ন
চাঁপাইনবাবগঞ্জে গান-বাজনা নিষিদ্ধের নোটিশ, প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার!

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার একটি গ্রামে মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় দুই মাস আগে ‘সমাজ সংস্কার’-এর কথা উল্লেখ করে জারি করা ওই নোটিশে বিয়েসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে গান-বাজনা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। এমনকি কোনো বিয়ে-বাড়িতে গান-বাজনা হলে সেখানে ধর্মীয় রীতিতে বিয়ে পড়াতে যাবেন না স্থানীয় আলেমরা, এমন কথাও উল্লেখ ছিল। বিষয়টি সম্প্রতি প্রকাশ্যে এলে প্রশাসন বিষয়টি খতিয়ে দেখে এবং পরে মসজিদ কমিটি তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার কথা জানায়।


সদর উপজেলার চরাঞ্চলের ইসলামপুর ইউনিয়নের তেররশিয়া পোড়াগ্রামে অবস্থিত একটি জামে মসজিদের কমিটির পক্ষ থেকে ‘গান-বাজনা বা বাদ্যযন্ত্রমুক্ত সমাজ গঠনের সিদ্ধান্ত’ শিরোনামে ওই নোটিশটি প্রচার করা হয়। নোটিশে দাবি করা হয়, গ্রামের পরিবেশ, যুবসমাজের নৈতিকতা ও পারিবারিক শান্তি রক্ষার স্বার্থে গণসম্মতির ভিত্তিতে প্রকাশ্যে উচ্চশব্দে গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, ইসলামের দৃষ্টিতে এসব কর্মকাণ্ড হারাম ও ক্ষতিকর হওয়ায় গ্রামের সামাজিক কল্যাণের জন্য এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নোটিশে মসজিদ কমিটির সদস্য ও গ্রামবাসীর পক্ষে ৩৪ জন স্বাক্ষর করেন এবং গ্রামের বিভিন্ন স্থানে ব্যানার ও ফেস্টুন টানানো হয়।


স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নোটিশ জারির পর থেকে গ্রামে প্রকাশ্যে গান-বাজনা প্রায় বন্ধ রয়েছে। তবে বিষয়টি সম্প্রতি প্রশাসনের নজরে এলে পুলিশ গ্রামে গিয়ে গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধ লেখা ব্যানার, ফেস্টুন ও নোটিশ জব্দ করে থানায় নিয়ে যায়।


সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মারুফ আফজাল রাজন জানান, বিষয়টি জানার পর মসজিদ কমিটির সদস্যদের তাঁর দপ্তরে ডেকে পাঠানো হয়। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে মসজিদের ইমামের নেতৃত্বে ৮ থেকে ১০ জন সেখানে উপস্থিত হয়ে জানান, বিষয়টি তারা না বুঝেই করেছেন। পরে তারা ভুল স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। একই সঙ্গে মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে সভা করে গান-বাজনা নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে লিখিতভাবে ইউএনও কার্যালয়ে জমা দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।


এদিকে, মসজিদে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ইমাম আবদুল মালিক বিন খালেদুর রহমানকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে জানান, তবে এরপর আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।


স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় দুই মাস আগে গ্রামবাসীর এক সভায় মসজিদের ইমাম ও কয়েকজন আলেমের নেতৃত্বে ‘সমাজ সংস্কার’-এর কথা বলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই সভায় স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে ঘোষণা করা হয়, গ্রামে কোনো ধরনের গান-বাজনা বা বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না। শুধু বিয়ের অনুষ্ঠান নয়, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ও ভ্রাম্যমাণ ফেরিওয়ালাদের ক্ষেত্রেও এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।


এ সিদ্ধান্তে গ্রামে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। গ্রামের প্রবীণদের একটি অংশ সিদ্ধান্তকে সমর্থন করলেও তরুণ প্রজন্মের অনেকেই এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কয়েকজন নারী জানান, বিয়ে-বাড়িতে গীত গাওয়া বা সাউন্ডবক্সে গান বাজানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি কোনো বিয়ে-বাড়িতে গান-বাজনা হলে সেখানে ধর্মীয় নিয়মে বিয়ে পড়াতে যাবেন না গ্রামের আলেমরা বলেও জানানো হয়েছে। এছাড়া কিশোরদের পিকনিক বা আনন্দ অনুষ্ঠানে সাউন্ডবক্সে গান বাজানোও বন্ধ হয়ে গেছে।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে গ্রামের এক প্রবীণ ব্যক্তি ও এক মাদ্রাসাছাত্র জানান, মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে আরও প্রচার করা হয়েছিল, যারা নামাজ পড়বে না, তাদের জানাজা পড়ানো হবে না। তবে গ্রামের অনেকেই এ বিষয়টি মানতে রাজি নন। তাদের মতে, নামাজ পড়া ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিষয় এবং এ কারণে জানাজা না পড়ানোর ঘোষণা দেওয়া ঠিক নয়।


স্থানীয় দোকানদারদের মধ্যেও এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়েছে। একজন দোকানদার বলেন, আমার দোকানে টিভি আছে, কিন্তু এখন আর গান বাজাই না। শুধু খবর বা ওয়াজ মাহফিল দেখি।


গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তি রবিউল ইসলাম বলেন, বিয়ে মানেই আনন্দের আয়োজন। সেখানে গান-বাজনা বা গীত গাওয়া গ্রামীণ সংস্কৃতির অংশ। তিনি বলেন, কেউ যদি গান-বাজনা বন্ধ করতে চায়, সেটা তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হতে পারে। কিন্তু পুরো গ্রামের ওপর এমন নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। আর একজন আলেম না এলে অন্য আলেম দিয়ে বিয়ে পড়ানো সম্ভব।


চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর আসনের সাবেক বিএনপি দলীয় এমপি হারুনুর রশিদ বিষয়টির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, এ ধরনের ঘোষণা রাষ্ট্র দ্রোহিতার সামিল। প্রশাসনের উচিত আইনগত ব্যবস্থা নেয়া,যাতে আর কেউ যেন  বাংলাদেশে এধরনের তথাকথিত ফতুয়া দিতে না পারে। 


চাঁপাইনবাবগঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ এন এম ওয়াসিম ফিরোজ জানান, বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশের পর তাদের পুলিশ  কার্যালয়ে এনে ভুল শিকার করে ছেড়ে দেওয়া হয়

তিনি আরও বলেন, পুলিশের  পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা কমিটি নিজ উদ্যোগে এমন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে না। বিষয়টি আইনগত ও সামাজিকভাবে সমাধান করা হবে।