শুক্রবার, আগস্ট ২৮, ২০২৬

অবক্ষয়

আইয়ুব আলী ২৭ আগস্ট ২০২৬ ১১:৩৪ অপরাহ্ন পাণ্ডুলিপি
আইয়ুব আলী ২৭ আগস্ট ২০২৬ ১১:৩৪ অপরাহ্ন
অবক্ষয়

কাজল জানতো ছেলেরা এই ধরণের অঘটন ঘটাবে। তাই সে সব বাদ্যযন্ত্র একটা ঘরে রেখে তালা মেরে রাতের ঘুম নিশ্চন্তে ঘুমিয়েছে। কিন্তু সকালে স্কুলে এসে তার মাথায় হাত। পুরো স্কুলে শুধু প্রসাবের গন্ধ। দুই তিন জায়গায় বমি করা হয়েছে। এক জায়গায় একটা নোংরা প্যান্টে মলও দেখতে পাচ্ছে। এই বিশ্রি গন্ধ তার সহ্য হচ্ছে না। আজ এসএসসি পরিক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠান। সবাই স্কুলে আসার আগেই তাকে সব পরিস্কার করতে হবে। সব কাজ তাকেই করতে হবে। এখন কাজলের একটু বয়স বেড়েছে। বেড়েছে শরীরের সুগার। অল্প পরিশ্রমেই ক্লান্ত হতে হয় তাকে। আজ এই বয়সে এসে তার গত ২০ বিশ বছরের স্মৃতিগুলো সে মাথায় সিনেমার রিলের মতো নিয়ে আসতে থাকে। ও যখন এই বিদ্যালয়ে পিয়ন পদে চাকরি নেয় তখন তার বয়স ছিল ২৪ বছর। তখন এই পদকে সবাই সম্মান জানিয়ে স্কুলের সবাই তার সাথে কথা বলতো। স্কুলে কেউ কখনো তাকে নাম ধরে ডাকতো না। ছাত্ররা নরম সুরে কাকা, ভাই ডেকে তাদের প্রয়োজনের কথা বলতো। যেন সে তাদের পরিবারের একজন সদস্য।


সবাই তাকে ভালবাসতো। আপন মনে করতো। মনে কষ্ট পাবে এমন কথা কেউ কখনো বলেননি। নইলে ২০ বছর কাটিয়ে দিতে পারতো না কাজল। এই স্কুল থেকে প্রতি বছর অনেক স্টুডেন্ট ভালো রেজাল্ট করে বের হয়। পিন্টু দাস এখন মন্ত্রণালয়ের সচিব হয়েছে। তার পরেও পিয়ন কাজলের সাথে দেখা হলে তাকে বড় ভাইয়ের মতই এখনও সম্মান জানিয়ে কথা বলে। ঈদের ছুটিতে বেড়াতে আসলে কাজলের সাথে কোলাকুলি করে। হৃদয়ের গভীর থেকে ঠান্ডা অনুভব নিয়ে কাজলের খবর নেয়। পিন্টু দাস কাজলকে এখনও পিয়ন মনে মরে না। কাজলও পিন্টু দাসকে ছাত্রাবস্থার মতই দেখতে পায়। পিন্টু যে সচিব।


বিশাল বড় চার চাকার এসি গাড়ি নিয়ে আসে। তার পরেও তাদের দেখা হলে, তাদের মধ্যে আন্তরিকতার কমতি নেই। নেই কোন আলাদা হাব ভাব। এমনই ভাবে আগে যারা এই স্কুল থেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পুলিশ অফিসার, সরকারি বড় চাকুরি যারা পেয়েছে তাদের আচরণের সাথে এই ব্যাচের ও তার পরের ব্যাচের স্টুডেন্টের আচরণ কাজল তার মনের কোন মাপকাঠিতে মেপে মিলাতে পারছেন না। আগের ব্যাচের স্টুডেন্টের ভালবাসা, জ্ঞান, মেধা, আন্তরিকতা, আচরণ, নৈতিকতা থেকে শুরু করে সবখানেই বর্তমান স্টুডেন্টদের মাঝে খুবই কম দেখতে পাচ্ছেন। তাই তো গত রাতে টিচাররা অনুমতি দিয়েছিলো রাত ১০ টা পর্যন্ত যেন স্টুডেন্টরা


স্কুলে থাকে। সাউন্ড বক্সের ভলিউম যেন মিডিয়াম রাখা হয়। সকল শর্তেই কিন্তু স্টুডেন্টরা একসাথে ঘাড় কাত করে সম্মতি জানিয়েছে। এই সম্মতি জানানো ছিলো ভাঁওতাবাজি। টিচার চলে গেল। তার পরেই শুরু করে উচ্চ ভলিউমে সাউন্ড বক্স বাজানো। বিকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পাশের বাড়ির সবাই শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে গেছে। রাত আটটার সময় কয়েক জনের অভিযোগ পেয়ে বিদ্যালয়ের মোহাম্মদ স্যার স্টুডেন্টদের সাথে কথা বলতে আসেন। স্যারের কথার বিরোধিতা করে বলে, তাদের বড় ভাইদের বিদায় অনুষ্ঠান খুবই জাগজমক করতে হবে। মঞ্চ সাজাতে হবে। কেউ কেউ মঞ্চে বিদায়ী বক্তব্য দিবেন তার অনুশীলন করবেন। এই জন্য তাদের আজ এই বিদ্যালয়ে রাতে থাকতেই হবে। মোহাম্মদ স্যার যখন স্টুডেন্টদের উচ্চস্বরে নিষেধ করতে লাগলেন। এমন সময় সেখানে এসে হাজির হলেন ফরিদ। ফরিদকে দেখে সুজন ছেলেটা বড় ভাই, বড় ভাই বলে ডাকতে লাগলেন আর বলতে শুরু করলো, এই জন্যই আপনাকে ফোন করে ডাকলাম। দেখেন না বড় ভাই আমরা আজ স্কুলে বিদায় অনুষ্ঠান উপলক্ষে একটু আনন্দ করবো মোহাম্মদ স্যার আমাদের নিষেধ করছেন। ফরিদের আগমন দেখে মোহাম্মদ স্যারও একটু দুর্বল হয়ে গেল। ফরিদ এই স্কুলেরই ছাত্র ছিলো। পাশের গ্রামে বাড়ি।


২০০৩ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে সে পাশ করতে পারেনি। এখন এলাকার সবাই তাকে নেতা নামে চিনে। সবাই এখন তার কথার দাম দিয়ে চলে। শুরুতে এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের সাথে সাথে ঘুরে বেড়াতো। চেয়ারম্যানের টুকিটাকি কাজ করে দিতো। এভাবে এলাকায় ফরিদের নেতা হয়ে উঠা। ফরিদ কোন চাকরি করে না, কোন ব্যবসা করে না, করে না কোন কৃষি কাজ। সারাদিন শুধু স্যুটপ্যান্ট পরে সরকারি দপ্তরে ঘুরে বেড়ায়। সরকারি কর্তাদের সাথে তার খুবই ভাব। এলাকার সবাই জানে সরকারি কিছু সেবা টাকার বিনিময়ে প্রকৃত উপকার ভোগীর পরিবর্তে সুবিধাবাদিদের পাইয়ে দেন। ইদানীং এই কাজও বেশি করতে চায় না। সে এখন আরও বড় ইনকামের ধান্দা পেয়ে গেছে। এখন তাকে থানার ওসি, রাজনৈতিক দলের উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের সাথে চলতে দেখা যায়। সবাই জানে কিন্তু কে বা জানে যে, এই ফরিদ এই এলাকার মাদেকের সরবরাহকারী। তার এই ওপেন সিক্রেট ব্যবসার কথা সবারই জানা। কিন্তু কেউ তার প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না।


গত ২০ বিশ বছরে এলাকার অভিভাবকদের কাছে এই বিষয়ে তাদের মনে আস্থা জন্মেছে যে, পড়া লেখা শেষ করে চাকরি করে জীবনে আর কয় টাকা কামানো যায়। তার চেয়ে তাদের ছেলে মেয়েরা দু ক্লাস পড়ে নেতার খাতায় নাম লিখাতে পারলেই তারা জীবনে বহু রোজগার করতে পারবে। এখানে ইনকামের কোন সীমাবদ্ধতা নাই। এই যে স্টুডেন্টরা আজ ফরিদকে আদর্শ মানছে। তাকেই ফোনে ডাকা হয়েছে। তার দেখানো পথ থেকেই এই ছোট্ট ছেলেরা নেশা কিনে এনেছে। অনেকের কাছে আজ হয়তো নেশার জগতে প্রথম দিন ছিলো তাই তাদের শারীরিক সমস্যা হয়েছে। এই ছেলেদের বাবা মায়েদেরও সমর্থন আছে। তাদের কাছে এখন পড়া লেখা খুব গুরুত্বপূর্ণ না। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তাদের ছেলেরা নেতার মত ভাব নিয়ে চলাফেরা করে বড় হবে। একদিন তারা নেতা হবে বড় নেতা হবে। হাট, ঘাট, পুলিশ, প্রশাসন সবই তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কাজলের সরল মনের সরল ভাবনা, অভিভাবকদের মানসিকতার এই অবক্ষয়ে দেশে রীতিমতো দাস ও সন্ত্রাস তৈরি হবে। যে দ্’ুএকজন পড়া লেখা শিখে চাকরি করবে তারাও এদের দলে মিশে সুদ, ঘুস নিয়ে নিজের জীবন যাপন করবে।


এই কাজল, কাজল! ডাক শুনে কাজলের অবচেতন মনে চৈতন্য ফিরে আসে। মোহাম্মদ স্যার কাজলকে নির্দেশ দিয়েছিলেন রাত ১০ টার সময় কাজল যেন সব কিছু একটা ঘরে রেখে তালা মেরে চলে যায়। কাজল স্যারের পরামর্শ অনুযায়ী তাই করে। এতে স্টুডেন্টরা কোন বাধা দেয় নি। তাই কাজলের মনে কোন সন্দেহ জাগে নি। এই স্টুডেন্টরা পরে বাজার থেকে পুনরায় সাউন্ড বক্স নিয়ে আসে। সাথে নিয়ে আসে বিভিন্ন রকমের নেশা দ্রব্য। এই নেশা খাওয়ার একটা সুবর্ণ রাত স্টুডেন্টরা হাত ছাড়া করতে চায়নি। নিশ্চিত একটা রোমাঞ্চকর রাত তারা উপভোগ করে কাজলের কাজ বাড়িয়ে দেয়। এখন কাজল মোহাম্মদ স্যারকে সালাম দিয়ে নিজের কাজে  দেয়।