শুক্রবার, আগস্ট ২৮, ২০২৬
নিয়োগের তিন মাসেও রাজশাহীতে দেখা মিলেনি এমডির

নেসকোকে বগুড়ায় নিতে প্রতিমন্ত্রীর চিঠি!

নিজস্ব প্রতিবেদক ০৯ মার্চ ২০২৬ ০৯:৪৯ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ০৯ মার্চ ২০২৬ ০৯:৪৯ অপরাহ্ন
নেসকোকে বগুড়ায় নিতে প্রতিমন্ত্রীর চিঠি!

নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসির (নেসকো) প্রধান কার্যালয় রাজশাহীতে। রাজশাহী থেকে আর কার্যক্রম চলে পুরো দুই বিভাগে। নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে বগুড়া স্থানান্তর করা হচ্ছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম নেসকোকে বগুড়ায় নিতে চিঠি দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে। 


স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য। নেসকোর প্রধান কার্যালয় নিজ জেলায় নিয়ে যেতে রাজশাহীবাসীর মধ্যে ক্ষোভ শুরু হয়েছে। সোমবার সকাল থেকে প্রতিবাদে সাধারণ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করছেন। নিজেদের ক্ষোভ জানাচ্ছেন।   


তবে অভিযোগ উঠেছে নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমানের স্থায়ী বাড়ি গোবিন্দগঞ্জ হওয়ায় বগুড়াতে তিনি প্রতিমন্ত্রীর মাধ্যমে নিতে চাচ্ছেন। মশিউর রহমান অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় নিয়োগ পেয়েছিলেন। তিনি গেল ডিসেম্বরে নিয়োগ পান। এরপর তিনি মাত্র রাজশাহীতে একদিন এসেছিলেন। নিজের অফিসও করেছেন বগুড়াতে। তিনি সেখানেই বসেন। তিনি চাচ্ছেন অফিস বগুড়াতে নিতে।  


বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীকে গেল ২৬ ফেব্রুয়ারি চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে প্রতিমন্ত্রী লেখেন, ‘নেসকোর অপারেশনাল এরিয়া উত্তরের পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলা সদর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা এবং পূর্ব-দক্ষিণের পাবনা জেলা। এর সদর দপ্তর দক্ষিণের জেলা রাজশাহীতে হওয়ায় রংপুর বিভাগের অপারেশনাল সব কাজ যথাযথভাবে যথাসময়ে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নেসকোর সার্বিক অপারেশনাল কাজে বিঘ্ন ঘটছে। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের মধ্যবর্তী স্থান বগুড়া জেলায় নেসকোর সদর দপ্তর প্রতিস্থাপন করা হলে সার্বিক অপারেশনাল কাজে গতি আসবে।’


মন্ত্রীকে তিনি আরও লেখেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, ব্যয় সাশ্রয়, প্রশাসনিক গতিশীলতা বৃদ্ধি এবং গ্রাহকসেবার মানোন্নয়নের স্বার্থে নেসকোর হেড অফিস বগুড়ায় স্থানান্তর একটি সময়োপযোগী ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত হবে বলে আমি গভীরভাবে অনুভব করি। এ বিষয়ে অবিলম্বে নীতিগত অনুমোদন প্রদান ও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের জন্য আপনার সদয়, জরুরি ও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত একান্তভাবে কামনা করছি।’


প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পক্ষ থেকে এমন চিঠি পেয়ে ৩ মার্চ বিদ্যুৎ বিভাগের কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স-১ শাখার উপসচিব ফারজানা খানম সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে একটি কমিটি করে দিয়েছেন। এর আহ্বায়ক করা হয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (সমন্বয় অনুবিভাগ) মোহাম্মদ সানাউল হককে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের একজন প্রতিনিধিকে সদস্য রাখতে বলা হয়েছে। ফারজানা খানমের এই চিঠিতেও সূত্র হিসেবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া চিঠির স্মারক নম্বর উল্লেখ আছে।


নেসকোর কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা বলছেন, বিএনপি সরকারকে বিপদে ফেলতে একক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান। তিনি বগুড়া শহরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। সেখানে তার পরিবার থাকে। তিনি রাজশাহীতে আসতে ইচ্ছুক নন। বগুড়া নেসকো অফিসে নিজস্ব কার্যালয় তৈরি করেছেন তিনি। সেখানেই অফিস করেন। আর পদোন্নতি থেকে মিটিং সব ঢাকায় বিদ্যুৎ অফিসে করেন। রাজশাহী থেকে তখন সবাই ঢাকায় যায়।


কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, নেসকো রাজশাহী থেকে বগুড়ায় নিলে দুর্নীতির আখড়াতে পরিণত হবে। সামনে অনেক কাজ আসবে। এগুলো হরিলুট করার জন্য বগুড়ায় নেওয়া হচ্ছে। নেসকোর প্রধান কার্যালয়ে প্রায় ৫০০ মানুষ কর্মরত। যাদের বাড়ি আশেপাশে জেলাতে। তারা বিপদে পড়বেন।     


এ বিষয়ে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত কয়েকবার নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমানকে কল দেওয়া হলে তিনি ধরেননি। তাই অভিযোগের বিষয়ে কোন উত্তর পাওয়া যায়নি।     


এমন উদ্যোগের বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান। তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে বিভাগীয় শহর রাজশাহী থেকে অনেক কিছুই অতীতে বগুড়ায় নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখেছি। এবারও যদি এটা হয়- তাহলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। এটা বাস্তবায়ন হলে সরকারেরই বদনাম হবে।


তিনি বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগ দুর্নীতিতে ভরা। রাজশাহীতে আমরা কিছু মানুষ আছি যারা নেসকোর অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকি। বগুড়ায় চলে গেলে কথা বলার কেউ থাকবে না। তারা যা খুশি তা-ই করবে। আমরা চাই, শিক্ষা নগরীতেই নেসকোর প্রধান কার্যালয় থাকুক। অন্যথায় নেসকোকে রক্ষায় আমরা রাজশাহীবাসী মাঠে নামতে বাধ্য হব।


রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন অর রশিদ বলেন, নেসকোর  প্রধান কার্যালয় রাজশাহীতে ছিল রাজশাহীতেই থাকবে। আমরা কোথাও যেতে দেব না। দরকার হলে আন্দোলনে নামবো। এই শহরেই থাকবে নেসকোর প্রধান অফিস।    


সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) জেলা সভাপতি আহমেদ সফি উদ্দীন মনে করেন, নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) মতো একটি বড় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সদর দফতর রাজশাহী থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা এই অঞ্চলের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি বিষয়টি নিয়ে সরকারকে আরও গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করার আহ্বান জানিয়েছেন।


তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর রাজশাহী একটি বড় প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে রাজশাহী বিভাগ ভেঙে খুলনা ও পরে রংপুর বিভাগ সৃষ্টি হওয়ায় এ অঞ্চলের প্রশাসনিক গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমেছে। বর্তমানে রাজশাহী একটি বিভাগীয় শহর হলেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর অন্যত্র স্থানান্তরের কারণে এর গুরুত্ব আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।


তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এ ধরনের প্রস্তাবের পেছনে কারও ভুল পরামর্শ বা অযাচিত প্রভাব থাকতে পারে, যা সরকারের ভাবমূর্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বিষয়টি নিয়ে সরকারকে সতর্ক ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।


বিদ্যুৎ বিভাগের কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স-১ শাখার উপসচিব ফারজানা খানম বলেন, একটা ডিও লেটারের পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে কমিটি করা হয়েছে। কমিটি এক মাস এ ব্যাপারে কাজ করবে। তারপর সুপারিশসহ প্রতিবেদন দেবে। সেটার পর সিদ্ধান্ত।