সোমবার, এপ্রিল ২০, ২০২৬
আমবাগান, ঘরবাড়ি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা

কালবৈশাখীর তাণ্ডবে বিপর্যস্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ১০:৫০ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ১০:৫০ অপরাহ্ন
কালবৈশাখীর তাণ্ডবে বিপর্যস্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জ

উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আমের রাজধানীখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় আকস্মিক কালবৈশাখী ঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। শনিবার (১৮ এপ্রিল) দিবাগত রাতের এই ঝড়ে জেলার শিবগঞ্জসহ পাঁচটি উপজেলায় আমবাগান, বসতঘর, দোকানপাট এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক হিসেবে হাজার হাজার গাছ উপড়ে পড়া এবং বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।


সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে জেলার অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি আমখাতে। শিবগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ৪৫০০ হেক্টর আমবাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. ইয়াছিন আলী।


স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকদিন আগের শিলাবৃষ্টির ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন করে এই ঝড় তাদের বড় ধরনের আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।


জালমাছমারি এলাকার আমচাষি সেরাজুল ইসলাম বলেন, গাছে ঝুলন্ত আমগুলো এখনই বাজারে আসার কথা ছিল, কিন্তু ঝড়ে ডাল ভেঙে ও গাছ উপড়ে যাওয়ায় সব শেষ হয়ে গেল।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ক্ষতি শুধু কৃষকদের নয়, পুরো জেলার অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ চাঁপাইনবাবগঞ্জের বড় অংশই আম উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল।


ঝড়ের তাণ্ডবে শিবগঞ্জ পৌর এলাকা ও আশপাশে অসংখ্য ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভেঙে পড়েছে। অনেক পরিবারের টিনের চাল উড়ে গেছে, কেউ কেউ ঘরহীন হয়ে পড়েছেন।


ছোটচক মাস্টারপাড়া এলাকার বাসিন্দা ইসরাইল হোসেন জানান, রাত ১২টার দিকে হঠাৎ ঝড় শুরু হয়, মুহূর্তেই সবকিছু অন্ধকার হয়ে যায়।


ঝড়ের প্রভাবে বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে পড়ায় পুরো জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। নেসকো এবং পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকায় ৮ থেকে ১১ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল।


নেসকোর আবাসিক প্রকৌশলী জুলফিকার আলী জানান, ৩৩ কেভি লাইনের একাধিক খুঁটি ভেঙে যাওয়ায় সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। দ্রুত মেরামতের কাজ চলছে।


অন্যদিকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার নৃপেন্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেন, পুকুরিয়া ও ছত্রাজিতপুর এলাকায় একাধিক খুঁটি ভেঙে গেছে। দ্রুত পুনঃসংযোগের চেষ্টা চলছে।


জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. ইয়াছিন আলী জানান, জেলায় গড়ে ১৭ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় সর্বোচ্চ ২০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। বৃষ্টির সঙ্গে দমকা হাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণে মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে।


শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম জানান, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র জানতে আমরা মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করছি। দ্রুত তালিকা তৈরি করে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেওয়া হবে।


প্রতি বছর কালবৈশাখী ঝড় হলেও স্থানীয় পর্যায়ে আগাম প্রস্তুতি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে আমনির্ভর এই অঞ্চলে বাগান সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


এই ঝড় শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি ও অবকাঠামোগত দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। এখন জরুরি হয়ে পড়েছে দ্রুত পুনর্বাসন, কৃষকদের আর্থিক সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ।