শুক্রবার, মে ০১, ২০২৬

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র

সোনার দেশ ২৯ এপ্রিল ২০২৬ ১১:১৯ অপরাহ্ন সম্পাদকীয়
সোনার দেশ ২৯ এপ্রিল ২০২৬ ১১:১৯ অপরাহ্ন
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র

গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা

পাবনার ঈশ্বরদীতে দেশের প্রথম এবং এ যাব’ কালের সর্বাধিক ব্যয়ী প্রকল্প পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। ২৮ এপ্রিল দুপুর ৩ টার দিকে পদ্মা নদী সংলগ্ন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির লোডিং কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। এরপর নানা ধাপ পেরিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার পর আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে পারে রূপপুরের প্রথম ইউনিট। 


রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে আর্থিক, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সব সহযোগিতা করছে রাশিয়া। প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই প্রকল্পের ৯০ শতাংশ অর্থ ঋণ দিচ্ছে রাশিয়া, যেটা ২৮ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান রোসাটমের সার্বিক তত্ত্বাবধানে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। 


বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল ৬০ বছর। এই সময়ে এখান থেকে পাওয়া যাবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। তবে প্রয়োজনীয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ সাপেক্ষে আরও ৩০ বছর পর্যন্ত কেন্দ্রটির আয়ু বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।


কেন্দ্রটিতে একবার জ্বালানি লোড করার পর তা দিয়ে চলবে টানা দেড় বছর। ফলে অন্যান্য বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো তেল, গ্যাস কিংবা কয়লা কেনার কোনো ঝক্কি-ঝামেলা নেই। দেড় বছর পর এক-তৃতীয়াংশ করে জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে।


নির্মাণ চুক্তি অনুযায়ী, তিন বছরের জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়া। অর্থাৎ এই সময়ে জ্বালানি আমদানি নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। এরপর বাংলাদেশকে জ্বালানি তথা ইউরেনিয়াম আমদানি করতে হবে। তবে  সেই জ্বালানি দুই বছর পর পর পরিবর্তন করলেই চলবে।


বাংলাদেশকে বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী  দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে- এই অর্জন শুধুমাত্র একটি কারিগরি মাইলফলক নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংগ্রামের ফসল। কেন্দ্রটি ইদ্বোধনের মধ্য দিয়ে দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এক গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা করলো।


১৯৬১ সালে যে স্বপ্নের বীজ বপণ করা হয়েছিল তা পাকিস্তান আমলের অবহেলা-স্বাধীনতা পরবর্তী পুনর্গঠন এবং গত দেড় দশকের অধিক সময়ের রাজনৈতিক মেরুকরণ পেরিয়ে আজ বাস্তবায়নের পথে।  


১৯৬৩ সালে ২৬০ একর জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে রূপপুরকে উপযোগী স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয়।  বেলজিয়াম ও ফরাসি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায়  ১৯৬৯ সাল নাগাদ ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি কেন্দ্র স্থাপনের চূড়ান্ত হলেও ততকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের  বৈষম্যপূর্ণ নীতির কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি। 


১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তৎকালীন সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে  রূপপুর প্রকল্পকে  নতুন জীবন দান করে। এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে। পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রকল্পটি আবারো স্থবির হয়ে পড়ে। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ফরাসি কম্পানি এসএম শেফারটম এবং জার্মান কম্পানি লাহমিয়া ইন্টারন্যাশনাল একাধিক সম্ভাব্যতা যাচাই করে রূপপুরকে কারিগরি ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক বললেও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের অভাবে পরবর্তী সরকাগুলো এই পথে হাঁটতে পারে নি।


২০০৯ সালে সরকার জ্বালানি সঙ্কট মোকাবিলায়  পারমাণবিক শক্তিকে অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে রাখে। রাশিয়ার সাথে ২০০৯ সালে সমঝোতা স্মারক এবং ২০১১ সালে  আন্ত:রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চুক্তির মাধ্যমে আধুনিক রূপপুর প্রকল্পের সূচনা হয়। 


অথচ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের যাত্রাকে এখন যে গৌরব হিসেবে দেখানো হচ্ছে, কয়েক বছর ধরে এটাকে ঘিরে নানা বিতর্ক ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক শক্তির টানাপোড়েন ছিল অত্যন্ত গভীর। সবকিছুর পরও রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র জাতির অগ্রগতিতে নতুন মাইল ফলক।