শুক্রবার, মে ১৫, ২০২৬

জিন ছাড়ানোর নামে ২১টি যৌন নিপীড়ন, লন্ডনে বাংলাদেশি ইমামের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

সোনার দেশ ডেস্ক ১৫ মে ২০২৬ ০৯:৫২ অপরাহ্ন আন্তর্জাতিক
সোনার দেশ ডেস্ক ১৫ মে ২০২৬ ০৯:৫২ অপরাহ্ন
জিন ছাড়ানোর নামে ২১টি যৌন নিপীড়ন, লন্ডনে বাংলাদেশি ইমামের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
পূর্ব লন্ডনে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে সম্মানিত ইমাম ছিলেন আব্দুল হালিম খান। ছবি: সংগৃহীত

পূর্ব লন্ডনের কমিউনিটিতে ‘সম্মানিত’ হিসেবে পরিচিত সাবেক ইমাম আব্দুল হালিম খানকে (৫৪) নারী ও শিশুদের ওপর ধারাবাহিক এবং ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন লন্ডনের স্নেয়ারসব্রুক ক্রাউন আদালত। ১১ বছর ধরে অন্তত সাতজন ভুক্তভোগীর ওপর পৈশাচিক নিপীড়নের দায়ে তাঁকে এই সাজা দেওয়া হয়। আদালতের রায় অনুযায়ী, তাঁকে কমপক্ষে ২০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।


আদালতে প্রসিকিউশন পক্ষ প্রমাণ করেছে, ২০০৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে হালিম খান ধর্মীয় প্রভাব ও অবস্থানের সুযোগ নিয়ে স্থানীয় বাংলাদেশি মুসলিম কমিউনিটির নারী ও শিশুদের টার্গেট করতেন। বিচারক লেসলি কাথবার্ট সাজা ঘোষণার সময় বলেন, ‘আপনি নিজের পাশবিক লালসা চরিতার্থ করার জন্য ক্ষমতার পদ্ধতিগত অপব্যবহার করেছেন। এমনভাবে আচরণ করতেন যেন আপনি আইনের ঊর্ধ্বে বা ধরাছোঁয়ার বাইরে।’


বিচারক আরও উল্লেখ করেন, হালিম খান সুকৌশলে এমন ভুক্তভোগীদের বেছে নিতেন, যাঁরা লোকলজ্জা বা ধর্মীয় কারণে মুখ খুলতে ভয় পাবেন। তিনি জানতেন যে যদি কেউ অভিযোগ করে, তবে মানুষ একজন ‘সম্মানিত ইমামের’ কথাই বিশ্বাস করবে।


মামলার শুনানিতে উঠে আসে শিউরে ওঠার মতো সব তথ্য। আব্দুল হালিম খান ভুক্তভোগীদের বিশ্বাস করাতেন যে তাদের ওপর বদ জিনের আছর আছে। চিকিৎসার নামে তিনি তাদের নির্জন ফ্ল্যাট বা গাড়িতে নিয়ে যেতেন। সেখানে তিনি নিজের ওপর ‘জিন’ ভর করার অভিনয় করতেন এবং এই ছদ্মবেশে তাদের ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন চালাতেন।


এক ভুক্তভোগী ‘আরিয়া’ (ছদ্মনাম) জানান, নির্যাতনের সময় হালিম খান তাঁকে চোখ বন্ধ রাখতে বলতেন এবং গাড়ির জানালায় টোকা মারার শব্দ শুনিয়ে বিশ্বাস করাতেন যে বাইরে অশুভ শক্তি ঘুরছে। আতঙ্কে ১৩ বছরের আরিয়া তখন সবকিছু সহ্য করতে বাধ্য হতো। আরেক কিশোরীকে তিনি এই বলে ভয় দেখিয়েছিলেন, মুখ খুললে তার পরিবার ‘কালো জাদুর’ প্রভাবে মারা যাবে।


দীর্ঘ তদন্ত ও বিচারের পর গত ফেব্রুয়ারি মাসে আদালত খানকে মোট ২১টি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে। এর মধ্যে ৯টি ধর্ষণের অভিযোগ; চারটি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ; ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুর ওপর দুবার যৌন আক্রমণ; ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুকে পাঁচবার ধর্ষণ এবং একটি পেনিট্রেশনের মাধ্যমে শারীরিক লাঞ্ছনা।


লিড প্রসিকিউটর সারাহ মরিস কেসি বলেন, হালিম খান ভুক্তভোগীদের ওপর ‘আজীবন স্থায়ী ক্ষত’ সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাদের ধর্মবিশ্বাসকে তাদের বিরুদ্ধেই ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করে তাদের মানসিক ও শারীরিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছেন।


আদালতে ‘ফারাহ’ (ছদ্মনাম) নামে এক ভুক্তভোগীর জবানবন্দি সবাইকে আবেগপ্রবণ করে তোলে। তিনি জানান, নির্যাতনের কথা পরিবারকে জানানোর পর তাঁর মা-বাবা তাঁকে বিশ্বাস করেননি, বরং তাঁকেই দোষারোপ করা হয়েছে। ফলে কিশোরী বয়সেই তাঁকে বাড়ি ছাড়তে হয়। তিনি বলেন, ‘আমি আজও আমার পরিচয় নিয়ে সংশয়ে থাকি। যাদের কাছে আমি সুরক্ষা আশা করেছিলাম, তারাই আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।’


ভুক্তভোগীদের একজন হালিম খানকে ‘শয়তানের প্রতিমূর্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, ধার্মিকতার পোশাক পরে হালিম খান যে অপরাধ করেছেন, তা সাধারণ অপরাধের চেয়েও জঘন্য।


তদন্তকারী দল মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা কর্মকর্তা জেনি রোনান বলেন, ‘আব্দুল হালিম খান নিজেকে একজন সদাচারী ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতেন, কিন্তু পর্দার আড়ালে তিনি ছিলেন এক ভয়ংকর অপরাধী।’ তিনি ভুক্তভোগীদের অসীম সাহসিকতার প্রশংসা করে বলেন, তাঁদের এগিয়ে আসার কারণেই আজ এই ন্যায়বিচার সম্ভব হয়েছে।


যুক্তরাজ্যে শিশুদের সুরক্ষায় কাজ করে এমন অন্যতম একটি দাতব্য সংস্থা নিশপ্যাক (এনএসপিসিসি)। এই সংস্থার একজন মুখপাত্র এ ঘটনাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, বিশ্বাসের জায়গায় বসে শিশুদের ওপর এমন নির্যাতন ক্ষমার অযোগ্য। এই রায় ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধীদের জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।


তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা অনলাইন