বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

দায়িত্বে গিয়ে ফিরলেন লাশ হয়ে, অপেক্ষায় ছোট্ট মেয়ে

নিজস্ব প্রতিবেদক ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:৪০ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:৪০ অপরাহ্ন
দায়িত্বে গিয়ে ফিরলেন লাশ হয়ে, অপেক্ষায় ছোট্ট মেয়ে

বাবা যে আর ফিরবেন না, তা জানে না ছোট্ট জুই। হয়তো বাবার ফেরার অপেক্ষাতেই আছে সে। চট্টগ্রাম সেনানিবাসের সরকারি বাসভবনে স্ত্রী ও শিশুকন্যাকে রেখে দায়িত্ব পালনে গিয়েছিলেন সেনাসদস্য তাসনিম রিফাত। পরিবারের ধারণা ছিল, প্রতিদিনের মতো দায়িত্ব শেষে আবার ফিরবেন তিনি। কিন্তু ফিরছেন না রিফাত—ফিরছে তাঁর নিথর দেহ। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ার রেঞ্জে ট্যাংক ফায়ারিংয়ের সময় বিস্ফোরণে নিহত হন সৈনিক (গানার) তাসনিম রিফাত (২৮)।


মৃত্যুর খবর রাজশাহীর পবা উপজেলার বিন্দারামপুর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর পর থেকেই সেখানে চলছে স্বজনদের আহাজারি। সবচেয়ে কঠিন অপেক্ষাটি এখন ছোট্ট জুইয়ের। বয়স এত কম যে বাবা আর কোনো দিন তাকে কোলে নেবেন না—এই কথার অর্থ বোঝারও বয়স হয়নি তার। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বেলা ১২টার দিকে হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ার রেঞ্জে ট্যাংক ফায়ারিংয়ের সময় দুর্ঘটনাবশত ট্যাংকের ভেতরে গোলা বিস্ফোরিত হয়। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান রিফাত। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আর্মড কোরের সদস্য ছিলেন এবং বর্তমানে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ১৫ স্বতন্ত্র সাঁজোয়া স্কোয়াড্রনে কর্মরত ছিলেন।


জানা গেছে, রিফাতের বাড়ি রাজশাহীর পবা উপজেলার দামকুড়া ইউনিয়নের বিন্দারামপুর গ্রামে। তাঁর বাবা আসাদুল ইসলাম একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী। মা তিন বছর আগে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মায়ের মৃত্যুর শোক সামলে ওঠার আগেই এবার ছেলের মৃত্যুতে পরিবারটিকে আবারও গভীর শোকের মুখোমুখি হতে হলো। চার ভাইবোনের মধ্যে রিফাত ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর বড় ভাই এবি মাহমুদ দীপ্ত এবং ছোট ভাই শামসাদ আহমেদ বিশাল। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে রিফাতের ছিল নিবিড় সম্পর্ক।


তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর খবর কেউ মেনে নিতে পারছেন না। রিফাত বিবাহিত ছিলেন। স্ত্রী ও কন্যাসন্তান জুইকে নিয়ে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের সরকারি বাসভবনে থাকতেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ছোট্ট মেয়েটিকে ঘিরেই ছিল তাঁর অনেক স্বপ্ন। মৃত্যুর খবর দুপুরের দিকে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর পর স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্রতিবেশীরাও ছুটে আসেন। বাড়ির ভেতরে স্বজনদের আহাজারি, আর বাইরে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ভিড়। কারও মুখে যেন সান্ত্বনার কোনো ভাষা নেই।


বুধবার রাত ১০টায় চট্টগ্রাম সেনানিবাসের জসিম হলে রিফাতের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পরে হেলিকপ্টারযোগে মরদেহ ঢাকায় নেওয়া হবে। সেখান থেকে রাজশাহী সেনানিবাসে আনার পর বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকাল নাগাদ পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে। এখন বিন্দারামপুরের বাড়িতে অপেক্ষা শুধু শেষবারের মতো রিফাতকে দেখার। যে ছেলেকে পরিবার কর্মস্থলে পাঠিয়েছিল সুস্থ শরীরে, তিনি ফিরছেন নিথর হয়ে। বাবার চোখে জল, ভাইবোনের আহাজারি আর ছোট্ট জুইয়ের অজানা অপেক্ষা—একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই বদলে দিয়েছে একটি পরিবারের পুরো পৃথিবী।