শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৬

২৫ হাজার বছর আগে কী খেয়ে নেশা করত মানুষ?

সোনার দেশ ডেস্ক ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:১৭ অপরাহ্ন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
সোনার দেশ ডেস্ক ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:১৭ অপরাহ্ন
২৫ হাজার বছর আগে কী খেয়ে নেশা করত মানুষ?
২৫ হাজার বছরের প্রাচীন কঙ্কালের দাঁত বিশ্লেষণ করেছেন অস্ট্রেলিয়ার গবেষকেরা। ছবি: সংগৃহীত।

সারাদিনের ব্যস্ততার পর সন্ধ্যায় সুরাপাত্রে চুমুক দেওয়ার অভ্যাস মানুষের নতুন নয়। কিন্তু মাদকের নেশা ঠিক কত পুরনো? হাজার হাজার বছর আগেও কি তার চল ছিল? কী ভাবে কোন কোন উপাদানের সাহায্যে নেশায় ডুব দিতেন পুরনো দিনের মানুষ? এ বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং বিজ্ঞানীদের কৌতূহল ছিলই। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার এক গবেষকদল মানুষের নেশার ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে নতুন তথ্য খুঁজে পেয়েছেন। ২৫ হাজার বছর আগে মানুষ কী খেয়ে নেশা করত, মিলেছে তার হদিস!



এত দিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, নব্যপ্রস্তর যুগে মানুষ কৃষিকাজ শুরু করার পর, যখন খাদ্য সংগ্রাহক থেকে সবে সবে খাদ্য উৎপাদক হয়ে উঠল, তখন থেকেই মাদক ব্যবহারের শুরু। বর্তমানে যেখানে ইজ়রায়েল, প্রত্নতাত্ত্বিকেরা সেখানে গাঁজানো অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় ব্যবহারের প্রমাণ পেয়েছেন। ১৩ হাজার বছর আগে ওই ধরনের পানীয় মাদক হিসেবে ব্যবহার করা হত। অনেকে তাকে বার্লি বিয়ারও বলেন। কিন্তু এর নেপথ্যে যে মাদক সেবনের অতি প্রাচীন অভ্যাস রয়েছে, তা এত দিন জানা যায়নি। সাম্প্রতিক গবেষণায় আরও পুরনো মাদক ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেল।


অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা প্রাচীন কঙ্কালে প্রাপ্ত দাঁত বিশ্লেষণ করে মানুষের নেশার ইতিহাস অনুসন্ধান করেছেন। গ্রিফিথের ‘অস্ট্রেলিয়ান রিসার্চ সেন্টার ফর হিউম্যান এভলিউশন’-এর অধ্যাপক কার্নি ম্যাথেসন এবং মিশেল ল্যাংলির নেতৃত্বে ওই গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ পত্রিকায়। তাঁরা দেখিয়েছেন, ১৩ নয়, ২৫ হাজার বছর আগেও মানুষের মধ্যে নেশার চল ছিল। তখন নেশা করা হত সুপারি দিয়ে!


ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েশি থেকে প্রাপ্ত প্রাচীন মানুষের দু’টি কঙ্কাল নিয়ে গবেষণা করেছেন অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীদল। দু’জনেই শিকারি ছিলেন। সমাজে তখনও কৃষিকাজের প্রচলন হয়নি। পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, দু’টি কঙ্কালের মধ্যে একটি আনুমানিক ২৫ হাজার থেকে ১৬ হাজার বছরের পুরনো, অন্যটি ৭৬০০ থেকে ৬৩০০ বছরের পুরনো। দু’টি ক্ষেত্রেই দাঁতে অস্বাভাবিক একপ্রকার ক্ষয় লক্ষ্য করেছেন গবেষকেরা। তাঁদের দাঁতে তৈরি হয়েছিল গভীর, গোলাকার খাঁজ। এর আগে কোনও মানুষের প্রাচীন নমুনায় এমন নিদর্শন দেখা যায়নি। গবেষকদের মতে, এটি নতুন এক ধরনের জৈব-প্রত্নতাত্ত্বিক চিহ্ন। দীর্ঘক্ষণ ধরে মুখের ভিতর গোটা সুপারি নিয়ে চুষতে থাকলে এই ধরনের খাঁজ দাঁতে তৈরি হতে পারে। মানুষের এমন আচরণের হদিস বিজ্ঞানীরা আগে পাননি।


সাধারণত, পানের সঙ্গে চুন এবং সুপারি চিবোলে সুপারির স্নায়ু উদ্দীপক গুণ সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু গোটা সুপারি চুষলে তার মধ্যেকার নিউরোঅ্যাক্টিভ অ্যালকালয়েড, আরেকলিন সক্রিয় হয় কি না, তার কোনও নিশ্চয়তা ছিল না। প্রাচীন কঙ্কালে সুপারি চোষার ইঙ্গিত দেখে বিজ্ঞানীরা বিষয়টি খতিয়ে দেখেন। গবেষণাগারে তাঁরা সুপারি কৃত্রিম লালায় ভিজিয়ে রেখেছিলেন। সেখানেই দেখা গিয়েছে, আস্ত সুপারি চুষলে পর্যাপ্ত পরিমাণে আরেকলিন নিঃসৃত হয়, যা মানুষের শরীরে নির্দিষ্ট কিছু প্রভাব ফেলতে পারে।


কার্নি ম্যাথেসন পৃথক একটি পরীক্ষা করে এই তত্ত্বকে আরও জোরালো করেছেন। জৈব-রাসায়নিক পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি প্রাচীন শিকারি মানুষের দাঁতের টিস্যুর মধ্যেও আরেকলিনের উপস্থিতি দেখিয়েছেন। ফলে তাঁরা যে সুপারি খেতেন, তা একপ্রকার নিশ্চিত। বিজ্ঞানীদের দাবি, কৃষিকাজ শেখার আগে ইন্দোনেশিয়ার আশপাশের শিকারি মানুষেরা সুপারি চুষে নেশা করতেন। তবে পান চিবানোর ফলে যে অনুভূতি হয়, তা সুপারি চুষে পাওয়া যেত না বলেই মত বিশেষজ্ঞদের। বরং, সুপারি চোষার ফলে ওই সময় মানুষ নির্দিষ্ট এক ধরনের দাঁতের রোগে আক্রান্ত হতেন। দুর্বল হয়ে উঠত তাঁদের দাঁত।


অনেকের মতে, দাঁতের ব্যথার উপশমের জন্য ওষুধ হিসেবে সুপারি চোষার চল ছিল। তবে প্রাথমিক ভাবে আরাম পাওয়া গেলেও এই অভ্যাস দাঁতের সমস্যা বাড়িয়ে দিয়েছিল। দাঁতের ক্ষয় এর ফলে এতই বেড়ে যেত যে, ভাল ভাবে খাওয়াদাওয়াও করা যেত না। ইন্দোনেশিয়ায় প্রাপ্ত দুই কঙ্কালের দাঁতেও সেই রোগ শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা। তার নেপথ্যে ছিল সুপারির নেশা।


তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন