বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

বাজারে আশ্বিনা, কাটিমন, গৌড়মতি, বারি-৪ ব্যানানার রাজত্ব

মো. সাজেদুল হক সাজু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:২৯ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
মো. সাজেদুল হক সাজু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:২৯ অপরাহ্ন
বাজারে আশ্বিনা, কাটিমন, গৌড়মতি, বারি-৪ ব্যানানার রাজত্ব

আমের মৌসুম শেষ হলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কানসাট আম বাজারে কমেনি ব্যস্ততা। মৌসুমি আমের সরবরাহ কমে এলেও আশ্বিনা, বারি-৪, বারি-৮, গৌড়মতি, খিরসাপাত  কাটিমন ও ব্যানানা ম্যাঙ্গোর মতো নাবি ও বারোমাসি জাতের আমে এখনো জমজমাট জেলার বৃহত্তম এই আম  বাজার।


প্রতিদিনই এখানে হাজার হাজার মণ আম বেচাকেনা হচ্ছে। মৌসুমের শেষ সময়ে নাবি জাতের আমকে ঘিরে বাজারের এমন কর্মচাঞ্চল্য চাষি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি করেছে নতুন সম্ভাবনা। 


এই কর্মচাঞ্চল্যের মধ্যেই চাষিদের বড় একটি অংশের সামনে উঠে এসেছে আরও আকর্ষণীয় সম্ভাবনা—অসময়ে খিরসাপাত ( হিমসাগর) আমের উৎপাদন ও বাজার জাতকরণ।


মৌসুম শেষ হওয়ার পরও শিবগঞ্জের কয়েকটি বাগানে গাছে ঝুলছে জিআই স্বীকৃত খিরসাপাত বা হিমসাগর আম। সাধারণত মে-জুন মাসেই বাজারে আসে এ জাতের আম। অথচ পরীক্ষামূলকভাবে আগস্ট মাসে খিরসাপাত উৎপাদন করে দেখিয়েছেন কয়েকজন চাষি। অসময়ে উৎপাদিত এসব আম বিক্রি হচ্ছে মৌসুমের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি দামে। কোথাও কোথাও বাগান থেকেই ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা মণ দরে কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন ক্রেতারা।


চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের বাজারে সাধারণত প্রতিদিনই আমের দামের দরদাম ওঠানামা করে। বেশ কিছু দিন আগেও বাজারে আমের দামে ভাটা পড়েছিল। তবে এখন আমের শেষ সময়ের নাবি জাতের আমের কারণে কানসাটে সেই চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। নাবি জাতের আমের দাম ভালো থাকায় কৃষকেরাও সন্তুষ্ট। জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে  চাষিরা এসব আম নিয়ে আসছেন কানসাট আম বাজারে। ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে ব্যস্ত হয়ে উঠছে বাজারের আড়তগুলো।


বর্তমানে কানসাট বাজারে আশ্বিনা আম প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, বারি-৪ ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা, গৌড়মতি ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা, কাটিমন ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা এবং ব্যানানা ম্যাঙ্গো ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি বাজারে মণ হিসেবে কিনলে দাম কিছুটা কম পড়ছে।


কাটিমন আম নিয়ে বাজারে আসা চাষি আশরাফুল ইসলাম বলেন, মৌসুমের শেষ মুহূর্তে কাটিমন ৬ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় এ দাম সন্তোষজনক।


বারি-৪ ও ব্যানানা ম্যাঙ্গো নিয়ে বাজারে আসা চাষি আবদুস সালামের অভিজ্ঞতাও একই। তাঁর ভাষ্য, প্রতি মণ বারি-৪ আম প্রায় ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা এবং ব্যানানা ম্যাঙ্গো প্রতি মণ ৮ হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। চলতি মৌসুমের শেষে প্রত্যাশিত মূল্য পাওয়ায় চাষিরা সন্তুষ্ট।


তিনি আরো বলেন, ক্রেতা-বিক্রেতাদের দরদামের কারণে আমের দাম কিছুটা কমিয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে। তবে মৌসুমের শেষ সময়ে নাবি জাতের আমের ভালো দাম পাওয়ায় চাষি, পাইকার ও ক্রেতা, তিন পক্ষই মোটামুটি সন্তুষ্ট।


কানসাটে দীর্ঘ এক যুগ ধরে অনলাইনে আমের ব্যবসা করছেন মো. ওয়ালিদ বলেন, সার, কীটনাশক, শ্রমিক ও বাগান পরিচর্যার ব্যয় বাড়লেও সব জাতের আমের দাম সে অনুপাতে বাড়েনি। ফলে বাজারে বিপুল পরিমাণ আম বেচাকেনা হলেও উৎপাদনকারীদের হাতে প্রত্যাশিত মুনাফা থাকছে না। এর প্রভাব পড়ছে আমের জাত নির্বাচনের ক্ষেত্রেও। ভালো দাম ও তুলনামূলক লাভের আশায় কাটিমন, গৌড়মতিসহ নাবি জাতের আম চাষের দিকে ঝুঁকছেন।


শিবগঞ্জের আমচাষি ইসমাইল হোসেন খান বলেন, জেলার অন্য চার উপজেলার সম্মিলিত উৎপাদনের চেয়েও বেশি আম উৎপাদন হয় শিবগঞ্জে। একসময় উপজেলার প্রায় ৮০ শতাংশ বাগানে ফজলি আমের চাষ ছিল। এখন তা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। অনেক চাষি ফজলির পরিবর্তে নতুন জাতের আমের দিকে ঝুঁকছেন বলে জানান তিনি।


চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের মধ্যে খিরসাপাত বা হিমসাগরের আলাদা পরিচিতি রয়েছে। দেশের বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও রয়েছে এ আমের চাহিদা। কিন্তু এ আমের মৌসুম সীমিত। সাধারণত মে মাসেই গাছে আসে খিরসাপাত। এবার সেই স্বাভাবিক সময়ের বাইরে আগস্টেও গাছে খিরসাপাত ধরিয়ে চমক দেখিয়েছেন শিবগঞ্জের কয়েকজন চাষি।


শিবগঞ্জ উপজেলার আড়গাড়া গ্রামের আমচাষি গোলাম মোস্তফা তাঁদের একজন। তিনি জানান, আগে মৌসুমি আম চাষ করলেও তেমন লাভবান হতে পারছিলেন না। পরে কাটিমন ও গৌড়মতি আমের চাষ শুরু করেন। এ সময় মৌসুমি খিরসাপাতের গাছের জাত পরিবর্তন করে কাটিমন আমের ডাল গ্রাফটিং করেন।


গ্রাফটিংয়ের পর তিনি লক্ষ্য করেন, কলম করা ডালে কাটিমন আম এলেও পুরোনো গাছের অংশে মুকুল এসেছে। সেই মুকুলের পরিচর্যা চালিয়ে যাওয়ার পর মৌসুমের বাইরে এসে সেখানে খিরসাপাত আম ধরে। এখন সেই আম প্রায় ২৫ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি করছেন তিনি।


গোলাম মোস্তফা বলেন, ইতোমধ্যে প্রায় ৮০ হাজার টাকার আম বিক্রি করেছেন। আগামীতে এই পদ্ধতি আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগিয়ে বেশি আম উৎপাদনের আশা করছেন তিনি।


শিবগঞ্জের ভাঙাব্রিজ এলাকার আমচাষি সজিব আলীর বাগানেও কাটিমনের পাশাপাশি ঝুলছে খিরসাপাত আম। অসময়ে গাছে এই আম দেখে প্রথমে তিনিও বিস্মিত হয়েছিলেন। তবে আম পরিপক্ব হওয়ার পর এর চাহিদা তৈরি হয়েছে। এমনকি বাগানে এসেই ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা মণ দরে আম কিনে নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন ক্রেতারা।


শিবগঞ্জ ম্যাঙ্গো প্রোডিউসার কো-অপারেটিভ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল খান শামীম বলেন, মৌসুমে খিরসাপাত আম কখনো কখনো মাত্র ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হয়। অথচ অসময়ে একই আমের দাম কয়েকগুণ বেশি।


তাঁর মতে, খিরসাপাত গাছে কাটিমন জাতের ডাল গ্রাফটিং করার পর পুরোনো অংশে খিরসাপাত এবং কলম করা ডালে কাটিমন আম পাওয়ার বিষয়টি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে পদ্ধতিটি এখনো পরীক্ষামূলক। এটি বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করে বাণিজ্যিক পর্যায়ে নেওয়া গেলে আম খাতের বাজার আরও বড় হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।


চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন বলেন, খিরসাপাতের দেশি-বিদেশি চাহিদা থাকলেও মৌসুমের শুরুতে একসঙ্গে বিপুল আম বাজারে আসায় চাষিরা কাঙ্ক্ষিত দাম পান না। অসময়ে খিরসাপাত উৎপাদনের বিষয়টি তাঁদের নজরে এসেছে জানিয়ে তিনি বলেন, এভাবে আম ধরানোর ঘটনা আগে তাঁদের জানা ছিল না। বিষয়টি নিয়ে তাঁরা কাজ করবেন।


কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতিকুল ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯১২ মেট্রিক টন। মৌসুম শেষের দিকে এসেও নাবি জাতের আমের সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।


চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও কৃষি উদ্যোক্তা মুঞ্জের আলমের মতে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষীরসাপাতি, ল্যাংড়া, ফজলি ও আশ্বিনা জিআই স্বীকৃত পণ্য। জেলার লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা আমের ওপর নির্ভরশীল। তাই এই খাতকে টিকিয়ে রাখতে আম প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলা, গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা এবং একটি পূর্ণাঙ্গ আম গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।


ঢাকা থেকে খিরসাপাত জাতের আম কিনতে আশা শফিকুল ইসলাম বলেন তার ধারনা মৌসুমের বাইরে খিরসাপাত উৎপাদনের পরীক্ষামূলক সাফল্য নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে সেই সম্ভাবনা কতটা টেকসই, এক গাছে ভিন্ন জাতের আম উৎপাদনের পদ্ধতি কতটা বৈজ্ঞানিকভাবে কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদে তা বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো গবেষণার অপেক্ষায়।


উল্লেখ্য  শুধু মৌসুমের কয়েক মাসের বাজারের ওপর নির্ভর না করে নাবি জাতের আম, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির সুযোগ বাড়াতে পারলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হতে পারে। তাই এবারের মৌসুমের শেষ বাজার শুধু আম বিক্রির শেষ অধ্যায় নয়। বরং বদলে যাওয়া আমচাষ ও নতুন সম্ভাবনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।