বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

পুরোনো পেশায় নতুন স্বপ্ন, দিন বদলের আশায় পবার ৩০ কারিগর

নিজস্ব প্রতিবেদক ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:১৭ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:১৭ অপরাহ্ন
পুরোনো পেশায় নতুন স্বপ্ন, দিন বদলের আশায় পবার ৩০ কারিগর

বাপ-দাদার হাতে শেখা কাজ। সেই কাজই বছরের পর বছর ধরে তাঁদের সংসারের চাকা ঘুরিয়েছে। কিন্তু সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের চাহিদা ও বাজারের ধরন। পুরোনো পেশায় দক্ষতা থাকলেও নতুন বাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় অনেকের আয় কমেছে, কমেছে কাজের সুযোগও। তবু পেশাটি ছাড়তে চান না তাঁরা। বরং পুরোনো পেশাকেই নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন রাজশাহীর পবা উপজেলার ৩০ জন কারিগর। এই স্বপ্নকে কিছুটা এগিয়ে নিতে তাঁদের দেওয়া হয়েছে দশ দিনের সফটস্কিল প্রশিক্ষণ।


প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে সনদ, দশ হাজার টাকা প্রশিক্ষণ ভাতা ও ১৮ হাজার টাকা করে অনুদান। তাঁদের প্রত্যাশা, প্রশিক্ষণে শেখা বিষয়গুলো কাজে লাগিয়ে গ্রাহকের সঙ্গে ভালোভাবে যোগাযোগ করতে পারবেন, কাজের পরিধি বাড়াতে পারবেন। অনুদানের টাকাও কাজে লাগবে পেশাটিকে আরও গুছিয়ে নিতে। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে পবা উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে ছিল এই প্রশিক্ষণের সমাপনী অনুষ্ঠান। সেখানে সনদ ও অনুদান হাতে পান দশটি আদি পেশার ৩০ জন কারিগর। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার মো. ইউসুফ আলী।


বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন পবা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ইবনুল আবেদীন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোহাম্মদ হোসেন খান। পবা উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের প্রান্তিক পেশাজীবী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পের আওতায় এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। এতে কামার, কুমার, জুতা মেরামতকারী, নাপিত, লোকজ যন্ত্রশিল্পী, নকশিকাঁথা শিল্পী এবং বাঁশ ও বেতের পণ্য প্রস্তুতকারীসহ দশটি আদি পেশার ৩০ জন অংশ নেন। দশ দিনের প্রশিক্ষণে শুধু পেশাগত কাজের কথা বলা হয়নি; গুরুত্ব পেয়েছে কাজের বাইরে থাকা কিছু প্রয়োজনীয় দক্ষতাও।


কীভাবে গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলতে হবে, কীভাবে সময়ের মূল্য দিতে হবে, আচরণ কেমন হবে এবং সেবার মান কীভাবে বাড়ানো যায়- এসব বিষয়ে ধারণা পেয়েছেন প্রশিক্ষণার্থীরা। একসময় এসব পেশার কাজ ছিল স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখন অনেক ক্ষেত্রেই আধুনিক পণ্য ও যন্ত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে তাঁদের। ফলে কেউ কেউ পেশা বদলের কথা ভাবলেও নতুন করে পাওয়া প্রশিক্ষণ ও সহায়তা তাঁদের পুরোনো পেশাকে আঁকড়ে থাকার সাহস জোগাচ্ছে। অনুদানের ১৮ হাজার টাকা এবং দশ হাজার টাকা প্রশিক্ষণ ভাতা তাঁদের কাছে শুধু আর্থিক সহায়তা নয়; পেশাটিকে টিকিয়ে রাখার একটি সুযোগও। কেউ এটি কাজে লাগাবেন সরঞ্জাম কিনতে, কেউ পণ্যের পরিধি বাড়াতে। লক্ষ্য একটাই,  বাপ-দাদার কাছ থেকে পাওয়া কাজটি যেন হারিয়ে না যায়, আর সেই কাজ দিয়েই যেন সংসারে আসে একটু স্বচ্ছলতা। 



উপজেলার চিনিকল বাজারের নাপিত মাসুদ রানা দীর্ঘদিন ধরে বাপ-দাদার পেশায় কাজ করছেন। প্রশিক্ষণ শেষে অনুভূতি প্রকাশ করে তিনি বলেন, “বাপ-দাদার কাছ থেকে শেখা এই পেশা আঁকড়ে ধরেই এত বছর সংসার চালিয়ে আসছি। সময়ের সঙ্গে মানুষের চাহিদা বদলেছে। প্রশিক্ষণে গ্রাহকের সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলা ও সেবার মান বাড়ানোর মতো নতুন বিষয় শিখেছি। ১৮ হাজার টাকা অনুদান পেয়ে মনে হচ্ছে, পুরোনো পেশাটাকে আরও ভালোভাবে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেলাম। এই টাকা দিয়ে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনে পেশাটিকে ধরে রাখতে চাই।” প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিভাগীয় কমিশনার মো. ইউসুফ আলী বলেন, “প্রান্তিক পেশাজীবীদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের পেশার আধুনিকায়ন জরুরি।


প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি নিজেদের উদ্যোগও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।” বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, “আদি ও প্রান্তিক পেশাগুলো আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। এসব পেশাজীবীর দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে তাঁদের কাজের বাজার ও আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। প্রশিক্ষণ ও অনুদানের সঠিক ব্যবহার তাঁদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।” সমাপনী বক্তব্যে ইউএনও মো. ইবনুল আবেদীন বলেন, “প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীরা পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি গ্রাহকসেবা ও যোগাযোগের বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক ধারণা পেয়েছেন। তাঁদের দেওয়া অনুদান নিজ নিজ পেশার কাজে বিনিয়োগ করলে দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়া যাবে। উপজেলা প্রশাসন এ ধরনের উদ্যোগে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।” অনুষ্ঠানে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ মেহেদী হাসান, পবা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলী হোসেন ও সদস্যসচিব আব্দুর রাজ্জাকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।