গ্রেপ্তার এড়াতে বাড়ি থেকে সড়ক পর্যন্ত ২০ সিসিটিভি, কবুতরের ঘরে ‘হ্যাকার সম্রাট’
গ্রেপ্তার এড়াতে বাড়ি থেকে গ্রামের প্রধান সড়ক পর্যন্ত অন্তত ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেছিলেন নাটোরের লালপুরের ‘হ্যাকার সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত ওহিদুল মোল্লা (৩২)। শুধু তাই নয়, নজরদারি এড়াতে বাড়ির একটি কবুতরের ঘরের ভেতর শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে থাকতেন তিনি। সেখান থেকেই ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার ও ইমো আইডি হ্যাকিং করে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হতো বলে পুলিশের অভিযোগ।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে লালপুর থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে ওহিদুলকে তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে। একই অভিযানে তার পাঁচ সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৯টি মুঠোফোন ও বিভিন্ন অপারেটরের ৬৮টি সিমকার্ড উদ্ধার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে আইনি প্রক্রিয়া শেষে গ্রেপ্তার ছয়জনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় লালপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আল মাসুম বাদী হয়ে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করেছেন।
গ্রেপ্তার অন্য পাঁচজন হলেন—লালপুরের মোহরকয়া গ্রামের জহুরুল বিশ্বাসের ছেলে সাব্বির হোসেন (২৩), মৃত বেলাল আলীর ছেলে মোতাকাব্বির আলী (২৩), বিলমাড়িয়া গ্রামের মৃত কফের আলীর ছেলে শুকুর আলী (৫০), পানসিপাড়া গ্রামের আধার প্রামাণিকের ছেলে মো. আলামিন (২৩) এবং রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আলাইপুর গ্রামের সামাদ মণ্ডলের ছেলে মুক্তার আলী (৩৪)।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের মোহরকয়া গ্রামের রব্বেল মোল্লার ছেলে ওহিদুল দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ইমো হ্যাকিং চক্রের ‘গুরু’ বা ‘সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার নেতৃত্বে একটি চক্র ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার ও ইমোসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আইডি হ্যাক করে দেশে ও প্রবাসে থাকা ব্যক্তিদের জিম্মি করে অর্থ আদায় করত বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার এড়াতে ওহিদুল নিজের বাড়িকে অনেকটা নিরাপত্তাবেষ্টিত করে রেখেছিলেন। বাড়ি থেকে গ্রামের প্রধান সড়ক পর্যন্ত অন্তত ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বাড়ির দিকে এগিয়ে এলে আগেভাগেই তা বুঝতে পারতেন তিনি।
তবে পুলিশের কাছে সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় ছিল তার থাকার ব্যবস্থা। কয়েকশ কবুতর রাখার জন্য তৈরি করা একটি ঘরের ভেতরই ছিল তার থাকার কক্ষ। বাইরে থেকে সাধারণ কবুতরের ঘর মনে হলেও ভেতরে ছিল খাট, দামি আসবাব, সিসিটিভি মনিটর ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র। পুলিশ বলছে, ওই কক্ষেই বসে সাইবার অপরাধের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন ওহিদুল।
অভিযানের সময় ওই ঘর থেকে ৬৮টি সিমকার্ড উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, সিমগুলো একটি সাদা কাগজে ছক আকারে সাজানো ছিল। কোন সিমে বিকাশ এবং কোনটিতে নগদ ব্যবহার করা হতো, তা বোঝাতে বিভিন্ন সাংকেতিক চিহ্নও দেওয়া ছিল। সিমগুলো সাতটি মুঠোফোনে অদলবদল করে ব্যবহার করা হতো বলে জানিয়েছে পুলিশ।
লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, ওহিদুল দীর্ঘদিন ধরে ডিজিটাল মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিলেন—এমন তথ্য পুলিশের কাছে ছিল। তার নেতৃত্বে এলাকায় একটি সাইবার অপরাধী চক্র সক্রিয় থাকার তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান শুরু করা হয়।
ওসি বলেন, গ্রেপ্তার এড়াতে ওহিদুল বাড়ির চারপাশে সিসিটিভি স্থাপন এবং কবুতরের ঘরের ভেতর থাকার মতো বিভিন্ন কৌশল নিয়েছিলেন। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।