বগুড়ার শেরপুরে ৯ শিক্ষার্থী উদ্ধার, উঠছে ‘লাইভনেস ভেরিফিকেশন’ নিয়ে প্রশ্ন
শুরুতে ঘটনাটি নিছক স্কুলশিক্ষার্থী অপহরণ বা আটকে রাখার বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হলেও উদ্ধারের পর সামনে এসেছে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। মাত্র ১০০ টাকার প্রলোভন দেখিয়ে শিশুদের ডেকে নেওয়া, একটি নির্দিষ্ট স্থানে আটকে রাখা এবং বুকের সামনে কার্ড ঝুলিয়ে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে ছবি ও ভিডিও ধারণের ঘটনায় সাইবার অপরাধের সম্ভাব্য যোগসূত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে বগুড়ার শেরপুর পৌরসভার মহিপুর কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির নয় শিক্ষার্থীকে স্কুল চলাকালে কৌশলে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে দীর্ঘ প্রায় আট ঘণ্টা পর শাজাহানপুর উপজেলার নয়মাইল বাজারসংলগ্ন একটি মুরগির খামারের গুদাম থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মঞ্জুয়ারা পারভীন জানান, নয় শিক্ষার্থীর মধ্যে আটজন সকাল সাড়ে ৯টার সমাবেশে উপস্থিত ছিল। তাদের বই-খাতা ও ব্যাগ শ্রেণিকক্ষেই ছিল। কিন্তু চতুর্থ ঘণ্টার ক্লাসে গিয়ে তাদের আর পাওয়া যায়নি। আশপাশে খোঁজাখুঁজি করেও সন্ধান না পেয়ে বিকেল ৩টার দিকে বিষয়টি অভিভাবকদের জানানো হয়।
উদ্ধার হওয়া এক শিক্ষার্থীর ভাষ্য অনুযায়ী, ১০০ টাকা ও ছবি তোলার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের একটি ইজিবাইকে তুলে নেওয়া হয়। পরে শাজাহানপুর উপজেলার নয়মাইল বাজারসংলগ্ন একটি মুরগির খামারের গুদামে নিয়ে তাদের আটকে রাখা হয়। গুদামের সাটার বন্ধ করে দিয়ে বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করলে হত্যাসহ নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখানো হয়।
একপর্যায়ে দুই শিশু টয়লেটে যাওয়ার কথা বলে বাইরে বের হতে সক্ষম হয়। পরে স্থানীয়দের কাছে তারা বিষয়টি জানালে অভিভাবকদের সহায়তায় অন্য শিক্ষার্থীদেরও অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
তবে ঘটনাটি এখানেই শেষ নয়। অনুসন্ধানে আরও একটি ঘটনার সঙ্গে এর মিল পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।
পৌর শহরের উত্তর সাহাপাড়ার ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর জানায়, গত ২১ আগস্ট তাকেসহ কয়েকজনকে একইভাবে শাজাহানপুর উপজেলার আড়িয়া বাজারসংলগ্ন ডেমাজানি রোডের একটি ফার্নিচারের দোকানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে তাদের বুকের সামনে পরিচয়পত্রের মতো দেখতে একটি কার্ড ধরে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে ছবি ও ভিডিও ধারণ করা হয়।
ওই কিশোরের দাবি, মোবাইল ক্যামেরার সামনে কখনো মুখ, কখনো ঘাড় এদিক-ওদিক ঘোরানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কাজ শেষে প্রত্যেককে ১০০ টাকা করে দেওয়া হয়। ওই দোকানে আরও অনেক কিশোরকে একইভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে এবং টাকা নিতে দেখেছে বলেও দাবি তার।
ছবি ও ভিডিও ধারণের এই পদ্ধতি নিয়ে প্রযুক্তি সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবায় ব্যবহারকারীর পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ‘লাইভনেস ভেরিফিকেশন’ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। এ প্রক্রিয়ায় ক্যামেরার সামনে থাকা ব্যক্তির জীবন্ত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে মুখ বা মাথা নির্দিষ্টভাবে নড়াচড়া করতে বলা হতে পারে।
আইটি বিশেষজ্ঞ মো. রুহুল আমিন বলেন, অপ্রাপ্তবয়স্কদের প্রলোভন দেখিয়ে এ ধরনের ছবি বা তথ্য সংগ্রহের পেছনে অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে। সংগৃহীত ছবি বা ভিডিও কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা তদন্ত করে দেখা জরুরি।
তিনি বলেন, শিশুদের কাছ থেকে এভাবে ছবি বা সম্ভাব্য বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করে ভুয়া অনলাইন অ্যাকাউন্ট, ভার্চুয়াল পরিচয় বা আর্থিক প্রতারণায় ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বাদী হয়ে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও কয়েকজনকে আসামি করে শেরপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
শেরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মঈনুদ্দীন বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। শিশুদের কেন সেখানে নেওয়া হয়েছিল এবং তাদের ছবি ও ভিডিও ধারণের সঙ্গে ঘটনার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের মাধ্যমে নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।