রামেক হাসপাতালে ‘ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে’ বাড়ছে মৃত্যু
রাজশাহী অঞ্চলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিপজ্জনক রূপ নিতে শুরু করেছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ক্রমাগত বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ। প্রতিদিন গড়ে ২৫ জনের বেশি নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে আসছেন। তবে সাধারণ লক্ষণের বাইরে গিয়ে এবার রোগীদের মধ্যে ‘ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম’ ও জটিল হৃদরোগ ‘মায়োকার্ডাইটিস’-এর মতো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। ফলে হাসপাতালে পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এ ধরনের রোগিরা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, জুন মাসের ৭ তারিখ থেকে শুরু হয়েছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হওয়া। তবে মারা যাওয়া শুরু হয়েছে আগস্ট মাস থেকে। শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ১৩ জন রোগী। এছাড়াও হাসপাতালে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৯০১ রোগী। এর মধ্যে ছিল ৮৩৩ জন প্রাপ্তবয়স্ক। এদের পুরুষ ৬১০ ও নারী ২২৩ জন। শিশু রোগী ছিল ৬৮ জন। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ৮০২ জন রোগী।
বর্ষার পর হাসপাতালে সর্বপ্রথম রোগী মারা যায় ৩১ আগস্টে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের বাসিন্দা আব্দুল হান্নান রামেক হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ১৪ ঘণ্টা পর মারা যান। তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম’। গেল ৯ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন পাবনার বেড়ার যুবক ইমরুল কায়েস। ভর্তির দেড় ঘণ্টা পর তিনি মারাও যান। ১০ সেপ্টেম্বর সকালে মারা যান নাটোরের বনপাড়ার বাসিন্দা জিৎ সরকার নামের এক কলেজছাত্র। তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন আগের সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে। ভর্তির ১৫ ঘণ্টা পর তিনিও মারা যান।
১৪ সেপ্টেম্বর মারা যান চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটের বাসিন্দা হৃদয় নামের আরেক যুবক। তিনি এর আগের দিন সকাল সাড়ে ৭টায় হাসপাতালে ভর্তি হন। মারা যান ভোর সোয়া চারটার দিকে। ১৫ সেপ্টেম্বর মারা যান চাঁপাইনবাবগঞ্জের পৌরসভার বালুবাগান এলাকার আসমা খাতুন নামের এক গৃহিণী। তিনি ১৪ তারিখ সন্ধ্যা ৬টার দিকে ভর্তি হন। মারা যান পরের দিন সকাল ৯টায়।
রাজশাহীর তানোর উপজেলার বাসিন্দা আনোয়ার মণ্ডল হাসাপাতালে ভর্তি হন ১৮ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে। আট ঘণ্টা পর তিনি মারা যান। রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার স্কুল শিক্ষার্থী সাথী রাণী হাসপাতালে ভর্তি হন ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুর দেড়টার দিকে। পরের দিন ভোর সাড়ে ৫টার দিকে তিনি মারা যান।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার বটতলা হাটের বাসিন্দা আব্দুল করিম ভর্তি হয়েছিলেন ১৬ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ১১টার দিকে। তিনি মারা যান ২১ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে। সবশেষ রাজশাহী নগরীর সুলতানাবাদ এলাকার নাসরিন নামের এক চাকরিজীবী মারা যান। তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২০ সেপ্টেম্বর সকাল সকাল ৭টার দিকে। মারা যান বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়।
গেল ২৫ দিনে (৩১ আগস্ট থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর) রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১১ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে এবং একজনের মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গুজনিত কারণে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে।
চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম (ডিএসএস) হলো ডেঙ্গু জ্বরের সবচেয়ে মারাত্মক ও প্রাণঘাতী একটি জটিলতা। অতিরিক্ত প্লাজমা লিক হওয়ার কারণে রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কমে গিয়ে রক্তপ্রবাহকে ব্যাহত করে। রক্তনালীর দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে রক্তরস বা প্লাজমা বাইরে বেরিয়ে আসে। শরীরের রক্তের পরিমাণ বা ভলিউম হঠাৎ কমে যায়, যার ফলে রক্তচাপ মারাত্মকভাবে হ্রাস পায় এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হয়। এ কারণে রোগীরা মারা যাচ্ছে দ্রুত। মৃত্যুর ঘটনাগুলোর বড় কারণ হলো হাসপাতালে দেরিতে পৌঁছানো এবং ডেঙ্গুর জটিলতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়া।
হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামিম আহমেদ জানান, জ্বর হলে অবহেলা করা বা স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে সময় নষ্ট করার ফলেই রোগীরা একেবারে শেষ পর্যায়ে হাসপাতালে আসছেন। ফলে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম কিংবা মায়োকার্ডাইটিসের মতো জটিলতায় আক্রান্ত রোগীদের বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ছে। জ্বর দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এনএস-১ পরীক্ষাসহ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।