বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের প্রতিষ্ঠাদিবস রোববার

মো. সফিকুল ইসলাম ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:৫২ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
মো. সফিকুল ইসলাম ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:৫২ অপরাহ্ন
বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের প্রতিষ্ঠাদিবস রোববার

১৯১০ সালের  ২৭ সেপ্টেম্বর আজকের দিনে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজশাহী শহরে ‘বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম’ প্রতিষ্ঠিত হয়। অবিভক্ত বাংলার ইতিহাসচর্চার পথিকৃৎ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়কে ‘সারথ্যে বরণ’ করে রমাপ্রসাদ চন্দসহ কৃৎবিদ্য নাগরিকদের নিয়ে মাতৃভূমির ইতিহাসচর্চা ও রচনার মহান প্রয়াসে নাটোর দিঘাপতিয়ার রাজপুত্র কুমার শরৎকুমার রায় এই মিউজিয়াম নিজ অর্থে প্রতিষ্ঠা করেন।


সূচনা থেকেই ‘বরেন্দ্র-অনুসন্ধান-সমিতি’ কর্তৃক মিউজিয়াম পরিচালিত হয়েছে, তাই বলা হয় ‘সমিতি’-ই মিউজিয়ামের মাতৃ-সংগঠন। সমিতি ও মিউজিয়ামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কুমার শরৎকুমার রায়, প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়। রমাপ্রসাদ চন্দ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও মিউজিয়ামের প্রতিষ্ঠাতা কিউরেটর ছিলেন। মর্যাদার দিক থেকে বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম ব্যক্তি উদ্যোগে স্থানীভাবে প্রতিষ্ঠিত ‘অবিভক্ত বাংলা’ এমনকি ভারতবর্ষের ‘প্রথম মিউজিয়াম’ এবং বাংলাদেশের যেকোনো শ্রেণির মিউজিয়ামের মধ্যেও প্রথম। 


প্রতিষ্ঠাতাগণ ১৯১০ সালের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে প্রত্ন-অনুসন্ধান দল গঠন করে রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানার বিভিন্ন গ্রাম থেকে ৩২টি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ননিদর্শন সংগ্রহ করে। এই ৩২টি প্রত্ননিদর্শন শহরের মিয়াপাড়ায় অবস্থিত রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগারের নিচতলার একটি কক্ষে রাখা হয় এবং প্রদর্শনের মাধ্যমে তখনই মিউজিয়াম চালু করা হয় ‘রাজশাহী মিউজিয়াম’ নামে। প্রত্ন-অনুসন্ধান দল ১৯১০-১৯১১ সালের মধ্যে বরেন্দ্রের বিভিন্ন এলাকা থেকে অনুসন্ধান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ প্রত্ননিদর্শন সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়।


রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগারে প্রত্ননিদর্শন সংগৃহীত হওয়ার পর গ্রন্থাগার চত্বরে একটি প্রত্নমেলার আয়োজন করে বরেন্দ্র-অনুসন্ধান-সমিতি, ১৯১২ সালের আগস্টে। তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত এই প্রত্নমেলা উদ্বোধন করেন বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেল। প্রত্নমেলার আলোড়ন ছড়িয়ে পড়ে উপমহাদেশজুড়ে। লর্ড কারমাইকেল ও সুধি-সমাজের উপস্থিতিতে তখন কুমার শরৎকুমার রায় বাংলা সরকারের কাছে প্রতিশ্রুত হন একটি প্রত্নতাত্ত্বিক মিউজিয়াম নির্মাণের জন্য।


প্রত্নপ্রদর্শনী দেখে লর্ড কারমাইকেল মুগ্ধ হন এবং এরই ধারাবাহিকতায় বেঙ্গল গভর্নমেন্ট ১৯১৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি জারিকৃত ১১নং প্রজ্ঞাপন দ্বারা সমিতিকে নিবন্ধন প্রদান করে। তবে, তা কার্যকর করা হয় সমিতি প্রতিষ্ঠার দিন অর্থাৎ ১৯১০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর থেকেই। ওই একই দিন (১৯১০, ২৭ সেপ্টেম্বর) থেকে বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের নিবন্ধনও কার্যকর করা হয়। তাই, বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠা ‘১৯১০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর’ হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। রাজশাহী মহানগরীর প্রাণকেন্দ্র হেতেম খাঁ মহল্লায় বর্তমান মিউজিয়াম ভবনের নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর ১৯১৬ সালের ১৩ নভেম্বর স্থাপন করেন বাংলার গর্ভনর লর্ড কারমাইকেল এবং ১৯১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ভবন উদ্বোধন করেন বাংলার গভর্নর লর্ড রোনাল্ডসে। একই দিনে দর্শনার্থীদের জন্য প্রত্ননিদর্শন প্রদর্শন উন্মুক্ত করা হয় এবং মিউজিয়াম গ্রন্থাগার চালু হয়। 


বরেন্দ্র-অনুসন্ধান-সমিতি ও বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠালগ্নেই কাজের প্রধান ভিত্তি নির্ধারিত হয় তিনটিজ্জ‘প্রত্ননিদর্শন  সংগ্রহ’, ‘গবেষণা’ ও ‘প্রকাশনা’। প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছরের মধ্যেই অমূল্য প্রত্ননিদর্শন, প্রত্নতাত্ত্বিক খনন, ঐতিহাসিক গবেষণা ও প্রকাশনার জন্য এই মিউজিয়াম দেশ-বিদেশে সমাদৃত হয়। বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম বাংলার প্রত্নতাত্ত্বিক খননের পথিকৃৎ। মিউজয়াম পরিচালিত সকল খননের অর্থায়ন করেন কুমার শরৎকুমার রায়। মিউজিয়ামের খননসমূহের মধ্যে নওগাঁ পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহার খনন সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্ববৃহৎ ও বিপুল ব্যয়সমেত। ঐতিহাসিক এই মহাবিহারে সর্বপ্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক পাঁচ বছর মেয়াদের খনন শুরু হয় ১৯২৩ সালের ১ মার্চ। কোদাল দ্বারা কুপ দিয়ে খনন উদ্বোধন করেন শরৎকুমার রায় এবং প্রথম দিন খনন পরিচালনা করেন অক্ষয়কুমার। 


 বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামে বর্তমানে নিবন্ধিত ১৮ হাজারেরও বেশি বহুমাত্রিক প্রত্ননিদর্শন রয়েছে। এই মিউজিয়ামে পাঁচ হাজার বছর পূর্বের সিন্ধুসভ্যতা’র (হরপ্পা-মহেঞ্জাদারো) প্রায় তিনশত প্রত্ননিদর্শন রয়েছে। এতো প্রাচীন নিদর্শন বাংলাদেশে আর কোনো মিউজিয়ামে নেই। আছে হাজার বছর আগের রঙ্গিন চিত্র-অংকন সম্বলিত বৌদ্ধধর্মীয় বিশ্বনন্দিত পুথি ‘অষ্টাসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা’।


প্রদর্শনে আছে সৌদিআরব থেকে নিয়ে আসা মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা.)-এর নিজ হাতে স্বাক্ষরিত হুবহু পত্রের প্রতিলিপি। মিউজিয়ামের আরও উল্লেখযোগ্য প্রত্ননিদর্শন হলো: ৩৮টি স্বর্ণমুদ্রা, খ্রিস্টপূর্ব মৌর্য আমলেরসহ বিভিন্ন শাসনযুগের সাড়ে ছয় হাজার মুদ্রা, পুথি ও পাণ্ডুলিপি প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার, দুই হাজারের অধিক প্রস্তরে নির্মিত বিভিন্ন শ্রেণির প্রত্ননিদর্শন (এর মধ্যে অতিমূল্যবান কৃষ্ণপ্রস্তরের ভাস্কর্য প্রায় দুই হাজার, ধুসর ও বালুকা প্রস্তর প্রায় তিনশত), সোমপুর মহাবিহারের প্রায় তিনশতসহ দেড় হাজার টেরাকোটা বা পোড়ামাটির ফলকচিত্র। মিউজিয়াম গ্রন্থাগারে রয়েছে পনের হাজারেরও অধিক দুর্লভ ও মূল্যবান গ্রন্থ-জার্নাল-পত্র-পত্রিকা।


এখান থেকেই ১৯১২ সালে প্রকাশিত হয় রমাপ্রসাদ চন্দ রচিত ও অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় সম্পাদিত ‘গৌড়রাজমালা’ ও অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় রচিত ‘গৌড়লেখমালা’ নামীয় বিখ্যাত গ্রন্থ। ‘গৌড়রাজমালা আধুনিক-বিজ্ঞান-সম্মত প্রণালীতে লিখিত বাংলার প্রথম ইতিহাস’ হিসেবে প্রথম স্বীকৃত করেন ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার (বাংলাদেশের ইতিহাস প্রথম খণ্ড, প্রাচীন যুগ, দেখুন- ভূমিকা)।

বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের বিপুল প্রত্নসম্পদ অতীত বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি—ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিল্প-সংস্কৃতি, ধর্ম-সমাজ-সভ্যতার জীবন্ত সাক্ষী। বস্তুতঃ এই মিউজিয়াম বাংলাদেশের পরম এক সাংস্কৃতিক সম্পদ ও অতীত ইতিহাসের দিকদর্শন বলা যেতে পারে। বাঙালি জাতি তথা বাংলার লেখ্য ইতিহাস সৃষ্টিতে বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম এবং এর প্রত্ননিদর্শন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশ্বসভ্যতার অংশ বিবেচনায় বিশশতকের দ্বিতীয় দশকে ‘সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ’ ‘বিশ্বঐতিহ্য’ হিসেবে বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামকে স্বীকৃতি প্রদান করে। বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সরকারি সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকট হস্তান্তর করা হয় ১৯৬৪ সালের ১০ অক্টোবর। শতাব্দী প্রাচীন ‘বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম’ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে গৌরবময় প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। 


লেখক: উপ-রেজিস্ট্রার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।