বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

জৌলুস হারাচ্ছে বেতের তৈরি আসবাব

নিজস্ব প্রতিবেদক ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:০৩ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:০৩ অপরাহ্ন
জৌলুস হারাচ্ছে বেতের তৈরি আসবাব

রাজশাহীতে দিন দিন জৌলুস হারাচ্ছে বেতের তৈরি আসবাবের বাজার। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত স্বল্প পরিমাণ সরু বেতের পাশাপাশি আমদানি করা বেতের ওপর টিকে আছে এই শিল্প। হারাতে বসা এই ব্যবসা থেকে বছরে আসছে অন্তত চার কোটি টাকা।


গ্রামীণ অর্থনীতি আর কারুশিল্পের দারুণ এক উপকরণ বেত। ২৪ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটারের রাজশাহীতে তিন দশক আগে সহজলভ্য হলেও এখন তা বিলুপ্ত প্রায় উদ্ভিদ। ফসলের মাপজোক, সংরক্ষণ থেকে শুরু করে গৃহস্থ জীবনের নানা কাজে যার ছিলো বিশেষ প্রয়োজন। যা দিয়ে তৈরি হয়েছে এক সময়ের মাপজোকের একক ধামা, কাঁঠা বা দাড়িপাল্লা।


দুর্গাপুর উপজেলার সুখানদিঘী গ্রামে দেখা মিলে দেশি বেতের ঝাড়। শুধুমাত্র এখানেই নয় এর পাশাপাশি বাগমারা এবং মোহনপুর উপজেলাতেও দেখা মেলে এমন দেশি বেতের ঝোপঝাড়ের। তবে  সেগুলো বাঁশের ঝাড়  এবং নদী পারেই দেখা য়ায় বেশি। 


সুখানদিঘী গ্রামের বেতচাষি আব্দুল মান্নান বলেন, প্রতি একবছর পরপরই আমরা বেত বিক্রি করে দিই। এইগুলো কেটে নিয়ে যায়। দেশি ৯টি প্রজাতির মধ্যে এখানে পাওয়া যায় তিন ধরনের বেত। যা ১৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। আর আমদানি করা প্রতিকেজি মোটা বেতের দাম ২৫০ টাকা।


কাঁঠ আর বাঁশের পর বনজ সম্পদ হিসেবে বেত এখনো ক্ষুদ্র রূপে অর্থের যোগান দেয় গ্রামীণ জীবনে। তবে কারিগরদের অভাবে গ্রামের ঝোপঝাড়ে জন্ম নেয়া বেত আসে শহরে। স্বাধীনতার আগে সিলেটি ব্যবসায়ীদের শিখিয়ে দেয়া বেতের ব্যবহার রাজশাহী নগরীর হোসনীগঞ্জের এই অংশকে পরিচিত করেছিলো বেতপট্টি হিসেবে। কাঁচামালের অভাবে সেসব দোকান এখন জৌলুস হারিয়েছে। এখনো গুটিকয়েক বেত কারখানার দেখা মেলে নগরীর বন্ধগেল ও বিলসিমলা এলাকায়। যা টিকে আছে স্থানীয় সরুবেত, বার্মা, থাইল্যান্ড ও পার্বত্য অঞ্চল থেকে আসা বেতের ওপর।


কারিগররা বলেন, পাকিস্তান আমলে সিলেট থেকে কিছু ব্যক্তি এসে হোসেনিগঞ্জে বেতের আসবাবপত্র বানাতে শুরু করেন। তারপর এই এলাকার নাম হয় বেতপট্টি। কয়েকজন বেঁচে থাকলেও তাদের পরবর্তি প্রজন্ম এই পেশায় আসেেত ইচ্ছুক না। তাই বেতের আসবাবপত্রও আর সেভাবে তৈরি করা হচ্ছে না। গ্রামগঞ্জে যে বেত হয় ওই বেতগুলো চিকন। ওই বেতে ডিজাইনের কাজ করে। আর মোটা যেগুলো সেই বেত আমদানীর মাধ্যমে সব দেশের বাহিরে থেকে আসে। টিকে থাকা এইসব কারখানায় ব্যস্ততা থাকে বছরজুড়ে। বিভিন্ন আকারের কেটে আনা বেত প্রক্রিয়া করে তৈরি করা হয় আসবাব। ক্রেতার চাহিদা মাথায় রেখে সৌখিন ও রুচিশীল ক্রেতাদের অর্ডার অনুযায়ী বেতের নানা পণ্য তৈরি করেন শিল্পীরা।


দুই দশক আগেও ১৫ থেকে ২০টি দোকান থাকা নগরীর বেতপট্টির দোকান সংখ্যা কমে নেমেছে অর্ধেকে। সময়ের ব্যবধানে বেতের আসবাবপত্র তৈরির ৮টি কারখানার স্থলে ২টি কারখানায় ধরে রেখেছে বেতপট্টি নামকরণের ইতিহাস। আধুনিক সভ্যতায় প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়াম সামগ্রীর দাপটে চাহিদাও কমেছে বেতের পণ্যের। পর্যাপ্ত পারিশ্রমিকের অভাবে কারিগর তৈরি না হওয়ার কারণেই বেত শিল্পের এই দৈন্য দশা বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। 


বেতপট্টির বেত বিপণীর স্বত্ত্বাধিকারী মাহবুবুর রহমান বলেন, প্লাস্টিকের জিনিসপত্রের দাম অনেক কম হওয়ায় সেদিকেই সবাই ঝুঁকছেন। আজ থেকে ১০-১৫ বছর আগে যেখানে ১০ হাজার টাকার উপরে বিক্রি হতো সেখানে এখন ৩ থেকে সাড়ে হাজার টাকার বিক্রি করাই কঠিন। দৈনিক বেচা বিক্রি কমে যাওয়ায় কারিগরদেরও বেশি পারিশ্রমিক দেওয়া সম্ভব হয় না। তাই নতুন কোনও কারিগরও তৈরি হচ্ছে না। 


তিনি আরও বলেন, রাজশাহীতে এখন শুধুমাত্র বেতপট্টি ও ঘোড়া চত্বরেই বেতের জিনিসপত্র পাওয়া যায়। বেতপট্টিতে দুইটি কারখানা ও চারটি দোকান এবং ঘোড়া চত্বরে তিনটি কারখানা ও ৭-৮টি দোকানেই টিকে আছে রাজশাহীর বেত শিল্প।


বেতের আসবাবপত্রের বিক্রেতা বলেন, বাচ্চাদের ঘুমানোর দোলনা, সোফা, রকিং চেয়ার, ফুলের টব, আয়না, খাট বিক্রি হচ্ছে। তৈরি হওয়া আসবাব সরবরাহ করা হয় আশপাশের বিভিন্ন জেলায়। যার আনুমানিক বাজার মূল্য অন্তত ৭০ লাখ টাকা। বাংলাদেশের সব জায়গায় আমাদের বেত চলে যায় খুচরা ও পাইকারি। এখান থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রংপুর, নওগাঁ, বগুড়া যায়।


ঐতিহ্য ধারনের পাশাপাশি বেতশিল্প টিকিয়ে রাখতে প্রশিক্ষণ, ঋণসুবিধাসহ নানা কর্মসূচির কথা জানান শিল্পগবেষক ও অর্থনীতিবিদরা। বর্ণালী ফার্নিচারের ব্যবস্থাপক হোসেন আলী বলেন, বাঁশ এখনো বাংলাদেশে ব্যাপক পরিমাণে উৎপাদিত হয় কিন্তু বেত প্রায় বিলুপ্তির পথে। সেজন্য বেতকে সংরক্ষণ করা উচিত। বর্তমানে বেতের জিনিসপত্র শখে রূপ নিয়েছে। তেমন বেচা-বিক্রি না থাকায় লোকসান ছাড়া লাভের মুখ দেখা দায়।


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, তাদের যদি স্বল্প সুদে ঋণ দেয়া হয় তাহলে  আমার বিশ্বাস এই ইন্ডাস্ট্রি আবার ঘুরে দাড়াবে এবং আমাদের কর্মসংস্থান যে অভাব আছে সেটা কিছুটা হলেও পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা আছে।