ঈশ্বরদীর বিলপাড়া গ্রামের হতদরিদ্র রাশিদার দারিদ্র জয়
১৮ বছর আগে স্বামী আব্দুস সালাম বিশ্বাস অন্য এক নারীকে বিয়ে করে রাশিদাকে ছেড়ে চলে গেছেন অন্যত্র। দুটি শিশু সন্তানের কারণে দ্বিতীয় বার আর বিয়ের পিঁড়িতে বসা হয়নি রাশিদার। একসময় স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠানের কারখানায় দিন হাজিরায় কাজ করলেও প্রতিবন্ধী হওয়ায় কাজ হারিয়েছেন অনেক আগেই। নিজের এক টুকরো জমিও নেই, ভূমিহীন হওয়ায় মায়ের সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই রেলওয়ের জমিতে কুঁড়েঘর তুলে বস্তিতে বসবাস করেন রাশিদা। নিজের শারীরিক প্রতিবন্ধিতার কারনে স্বামী ছেড়ে গেলেও দুটি সন্তান ও মাকে নিয়ে এখনো ঈশ্বরদীর সাঁড়া গোপালপুর বিলপাড়া গ্রামের কুঁড়ে ঘরেই বসবাস করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস। গ্রামীণ নারীদের অধিকার ও উন্নয়নের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই দিবস সম্পর্কে কিছুই জানেন না রাশিদা। ঈশ্বরদী উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সুবিরকুমার পালের মতে গ্রামের এই হতদরিদ্র নারী নিজের জায়গা থেকে এখনো গ্রামীন নারী হিসেবে প্রতিবন্ধীতা জয় কর যেভাবে সততার সঙ্গে জীবনযাপন করছেন তা অনুকরণীয়।
শারীরিক প্রতিবন্ধী হতদরিদ্র রাশিদা না খেয়ে থাকলেও কখনো ভিক্ষাবৃত্তি কিংবা কারো কাছে হাত পাতেন নি কখনো। রাশিদা জানান, আবেদন করার পরও এখনো তিনি পাননি প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড। একদিকে ছেলে মেয়ের ভবিষ্যৎ অন্যদিকে বৃদ্ধা মাকে নিয়ে সংসারের ৪ জনের আহার জোটানোই দায় হয়ে পড়ে তার। কাজ হারিয়ে দিশেহারা হলেও আশা ছাড়েননি, ধারদেনা করে একটি ছাগল কিনে লালন করা শুরু করেন তিনি। একটি ছাগল দিয়ে নতুন আশা বুনতে বুনতে একে একে তিনি ৩০টি ছাগলের মালিক। ছাগল চরিয়েই দুবেলা নিজের ও মায়ের আহারের যোগাড় করেন রাশিদা।
রাশিদার প্রতিবেশী রওশন আরা বেগম বলেন, ভাঙা পায়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ছাগল নিয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়ালেও রাশিদা কখনো কারো কাছে ভিক্ষার হাত বাড়িয়ে দেননি। ছাগল চরিয়ে অনেক কষ্ট করে জীবনের কঠিন পথ পাড়ি দিচ্ছেন তিনি।
পাবনার ঈশ্বরদীর সাঁড়া গোপালপুর বিলপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রাশিদা খাতুন বলেন, আট বছর বয়সে গাছ থেকে পড়ে পা ভেঙে আহত হওয়ার পর থেকে প্রতিবন্ধী জীবন যাপন করছেন তিনি। নিজের শারীরিক অক্ষমতার কারণে স্বামী তাকে ছেড়ে গেছে, তবুও হাল না ছেড়ে এখনো জীবন যুদ্ধে পথে পথে, রেললাইনের ধারে ছাগল চরিয়ে বেড়ান রাশিদা। তিনি বলেন, বয়স ৪৪ পেরিয়েছে। এমনিতেই ভাঙা পায়ে চলাফেরা করতে অনেক কষ্ট হয়। তবুও ছাগলগুলিকে নিজের সন্তানের মত লালন করেন। অভাবের সঙ্গে লড়াই করে ছাগল আঁকড়ে ধরে থাকলেও এখন জীবন চালানো দায় হয়ে পড়েছে। রাশিদা বলেন, চরম দুঃসময়েও ভিক্ষা করিনি। কখনো কারো কাছে হাত পাতিনি।
প্রতিবন্ধী ভাতার বিষয়ে ঈশ্বরদী উপজেলা সমাজসেবা অফিসার আতিকুর রহমান বলেন, প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য রাশিদা খাতুন আবেদন করেছেন কিনা তা আমার জানা নেই, তবে তিনি নতুন করে আবেদন করলে তার প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড করে দেওয়া হবে। ঈশ্বরদী উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা আকলিমা খাতুন বলেন, একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও হতদরিদ্র রাশিদা কঠোর প্ররিশ্রম করে ছাগল পালন করার মধ্য দিয়ে নিজের জীবন চালানোর অদম্য শক্তি দেখিয়েছেন যা অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে।