তিন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা, লালইচ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপন
একটি বারান্দা, শিক্ষার্থী মাত্র তিনজন। সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার যাত্রা। এক শতাব্দী পেরিয়ে সেই ছোট্ট পাঠশালা আজকের রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার লালইচ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে পড়াশোনা করছে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী। তবে শতবর্ষের গৌরবের মধ্যেও রয়ে গেছে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। ১৯৭২ সালে নির্মিত একটি ভবন পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়।
১৯২৫ সালে স্থানীয় উদ্যোগী ব্যক্তি গিরিধর সরকারের হাত ধরে বিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু হয়। প্রথমে একটি বারান্দায় চলত পাঠদান। পরে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় বাঁশের বেড়া ও টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি করা হয় পাঠদানের ঘর। সময়ের সঙ্গে বেড়েছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা, বিস্তৃত হয়েছে শিক্ষার পরিধি। এই বিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করে অনেকে দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। কেউ কেউ কাজ করছেন দেশের বাইরেও।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিদ্যালয়টির শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে আয়োজন করা হয় বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের। সকাল সাড়ে ৮টায় র্যালির মধ্য দিয়ে শুরু হয় কর্মসূচি। পরে স্মৃতিচারণ, আলোচনা সভা, প্রাক্তন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্মাননা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও র্যাফেল ড্র অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘদিন পর পুরোনো সহপাঠী ও প্রিয় শিক্ষকদের কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অনেকে। স্মৃতিচারণে উঠে আসে শৈশবের দিনগুলো এবং জীবনের প্রথম পাঠশালার অবদান।
বিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি থেকে এ পর্যন্ত ৪৪ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছে। বর্তমানে বিদ্যালয়ে সাতজন শিক্ষক ও একজন অফিস সহকারী রয়েছেন। শিক্ষার্থীদের বই পড়ার সুযোগ করে দিতে রয়েছে একটি লাইব্রেরিও। তবে প্রয়োজনীয় আধুনিক অবকাঠামোর অভাব এখনো রয়েছে। শতবর্ষের এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ও অর্জনের পাশাপাশি নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ এবং মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিও সামনে এসেছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শতবর্ষ উদযাপন কমিটির সভাপতি ও দুর্গাপুর উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. খলিলুর রহমান শেখ। প্রধান অতিথি ছিলেন রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা সহকারী মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান এবং রায়ঘাটি ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ইমাম হাসান শামীম।
এ ছাড়া স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ, প্রাক্তন শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মোহনপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক আব্দুস সামাদ ও বিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী শিক্ষিকা মাস্তুরা পারভীন।
বর্তমান সরকারের শিক্ষা কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে এমপি মিলন বলেন, সরকার একটি চাহিদা ও জ্ঞানভিত্তিক কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছে। শিক্ষার্থীদের বহুমুখী শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি নিজস্ব ধর্মের চর্চাও জরুরি। ধর্মীয় অনুশাসন ছাড়া কোনো শিশু ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারে না, তাই মুসলমানদের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মের শিশুরাও যেন নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারে সেই ব্যবস্থা থাকতে হবে। এছাড়া শিশুদের মেধা বিকাশে খেলাধুলা, গান-বাজনা ও কবিতা আবৃত্তির সুযোগ সৃষ্টির ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে এমপি বলেন, আমাদের দেশ ভৌগলিকভাবে সমৃদ্ধ এবং এর মাটিকে ‘সোনা’ বলা হলেও ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো এই সম্পদকে লুট করে নিজেদের কাজে ব্যবহার করেছে। এই অবস্থা থেকে দেশকে সত্যিকারের ‘সোনার বাংলা’য় রূপান্তর করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরোও বলেন বিদ্যালয়ের বিল্ডিং, মাঠ, বেঞ্চ, চক বা ডাস্টার সবকিছুই শিক্ষার্থীদের জন্য, তাই ছাত্র-ছাত্রীদের স্বার্থকেই সবার আগে প্রাধান্য দিতে হবে।
বর্তমান প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সমালোচনা করে এমপি মিলন বলেন, শিক্ষকরা স্কুলে এসে পাঠদানের বদলে নিজেদের হাতের কাজ বা অন্যান্য জিনিস তৈরি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন বলে অভিযোগ শোনা যায়। তিনি মনে করেন, এটি শিশুদের ঠিকমতো শিক্ষা প্রদানের পথে একটি বড় বাধা।
এক শতাব্দী আগে তিন শিক্ষার্থীকে নিয়ে শুরু হওয়া এই বিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপন তাই শুধু অতীতের স্মৃতিচারণ নয়, ভবিষ্যতের প্রত্যাশাও। স্থানীয়দের চাওয়া, ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করে নিরাপদ, আধুনিক ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক, যাতে আগামী প্রজন্মও এখান থেকে শিক্ষার আলো নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে।