দুর্নীতি ধরিয়ে দেয়ায় চাকুরিচ্যুত শামসুল; বিচারের আশায় ঘুরছেন পথে পথে
দি ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিস লিমিটেডে দীর্ঘদিন নিষ্ঠা ও সততা সাথে দায়িত্ব পালনের পর প্রতিষ্ঠানের ভেতরের দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রতিবাদ করায় শামসুল হক নামের এক ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিষ্ঠানের সাবেক সহকারী সিকিউরিটি সুপারভাইজার শামসুল হক এই অভিযোগ তুলে বর্তমানে স্ত্রী সন্তান নিয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন বলেও জানান। চাকরি হারানোর পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপ নেয়ায় তাকে ও তার পরিবারকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে, প্রাণভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
নিরাপত্তা চেয়ে থানায় লিখিত দিতে গেলে তা না নেয়ায় এর প্রতিকার চেয়ে অবশেষে গত ২০ সেপ্টেম্বর’২৬ তারিখে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী শামসুল হক। জীবনের নিরাপত্তা ও ন্যায় বিচার চেয়ে বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে পাবনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি। ভুক্তভোগী শামসুল ইসলাম পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার মিরকামারী দক্ষিণপাড়া গ্রামের বাসিন্দা।
ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট অভিযোগের কাগজপত্র সূত্রে জানা যায়, মো. শামসুল হক ২০০৫ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ১৯ বছর দি ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিস লিমিটেডের প্রধান কার্যালয়ে নিষ্ঠা ও সততার সাথে সহকারী সিকিউরিটি সুপারভাইজার পদে কর্মরত ছিলেন। কর্মকালীন সময়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কর্মকাণ্ড দেখতে পেয়ে তিনি তা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন।
অভিযোগ রয়েছে, এরপর থেকেই প্রভাবশালী কিছু অসৎ কর্মকর্তা তার ওপর ক্ষুব্ধ হন এবং তাকে নানাভাবে হয়রানি শুরু করেন। একপর্যায়ে দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতি মাসে তার বেতন থেকে ৫ হাজার ৭৫০ টাকা কর্তন করা হয়। এভাবে ২০২১ সাল থেকে ২০২৪ সালে চাকুরীর যাওয়ার আগ পর্যন্ত ৪ বছর ৩ মাসে তার বেতন থেকে প্রায় ৩ লাখ টাকা কেটে নেয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে যাতে তিনি আইনি পদক্ষেপ নিতে না পারেন সেজন্য বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এর আগে বেতন কাটা বন্ধ করতে কোম্পানীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর ২০২২ সালের ৮ আগস্ট লিখিত আবেদন করেছিলেন শামসুল। কিন্তু তাতে কোনো সুরাহা হয়নি।
কুল কিনারা না পেয়ে হয়রানি ও বেতন কর্তনের প্রতিকার চেয়ে শামসুল হক ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবির মাধ্যমে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ও দুর্নীতি ধরিয়ে দেওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়ায় কোম্পানীর চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক সহ ১৫ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে লিগ্যাল নোটিশ পাঠান। এর পরিপ্রেক্ষিতে কোনো ধরনের কারণ দর্শানো নোটিশ বা সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ছাড়াই ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরবর্তীতে তিনি বাধ্য হয়ে চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। তবে সেখান থেকেও কার্যকর কোনো প্রতিকার পাননি বলে তার দাবি। আর বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দেওয়ায় ক্ষুব্ধ অভিযুক্ত কর্মকর্তারা তাকে গুম করে ফেলার হুমকি দিয়েছে বলে অভিযোগ শামসুল ইসলামের।
শামসুল ইসলামের দাবি, ঢাকার হেড অফিস থেকে রংপুর কারখানায় বদলী করার পর তখন হুমকি ধামকি পেয়ে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে চলতি বছরের ১২ অক্টোবর তিনি কোতোয়ালি থানা (আরপিএমপি, রংপুর) সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও আইনি সহায়তার আবেদন করেছেন। তার আগে পাবনার ঈশ্বরদী ও সদর থানায় জিডি করতে গেলেও অজ্ঞাত কারণে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তার জিডি গ্রহণ করেনি থানার ওসি।
শামসুল ইসলাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, চাকরি হারানোর পর আর স্ত্রী-সন্তান নিয়ে খেয়ে না খেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। প্রাণনাশের আশঙ্কায় আর বিচারের আশায় পথে পথে ঘুরছেন। স্ত্রী সন্তানকে তরকারি ছাড়া ভাতের মাড় খেয়ে থাকতে হচ্ছে। কতদিন যে মাছ ডিম খায়না বলতে পারবো না। কিন্তু কয়দিন চলবে এভাবে। আমিও তো মানুষ, আমারও তো ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। তাই সাংবাদিকদের মাধ্যমে সরকারের কাছে আবেদন জানাই ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিস লিমিটেডের দুর্নীতি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিন আর আমার চাকুরী ও কর্তন করা টাকা ফিরিয়ে দিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করুন।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিস লিমিটেডের কয়েকজন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে পাওয়া যায়নি।