শুক্রবার, অক্টোবর ৩০, ২০২৬

অপূর্ণ ভালোবাসা

আবুল হোসেন ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ১১:২২ অপরাহ্ন পাণ্ডুলিপি
আবুল হোসেন ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ১১:২২ অপরাহ্ন
অপূর্ণ ভালোবাসা

শরতের এক বিকেলে প্রিয়ন্তির সঙ্গে সাফিনের প্রথম দেখা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে। বাইরে তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছিল। জানালার পাশে বসে প্রিয়ন্তি একটা উপন্যাস পড়ছিল, আর সাফিন খুঁজছিল কবিতার বই। হঠাৎ সাফিনের হাত থেকে কয়েকটি বই মেঝেতে পড়ে গেল। প্রিয়ন্তি বইগুলো তুলে দিতে গিয়ে মৃদু হেসে বলেছিল, এত বই একসঙ্গে নিয়ে পড়াশোনা করো, নাকি শুধু বইয়ের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখো? সাফিন একটু অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। তারপর হেসে বলেছিল, নিজেকে লুকিয়ে রাখি না। তবে কিছু কথা আছে, যেগুলো বইয়ের মানুষদের বলতে পারি, বাস্তবের মানুষদের বলতে পারি না। প্রিয়ন্তি হেসে বলেছিল, তাহলে একদিন তোমার সেই না-বলা কথাগুলো আমাকে বলো। সেদিনের সেই ছোট্ট কথোপকথন যে একদিন তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অথচ বেদনাময় অধ্যায়ের সূচনা করবে, তা কেউ জানত না।


১. ভালোবাসার অগ্রসরতা

তারপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই তাদের দেখা হতে লাগল। কখনো গ্রন্থাগারে, কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ মাঠে, কখনোবা ক্যাম্পাসের পাশের ছোট্ট চায়ের দোকানে। সাফিন ছিল শান্ত স্বভাবের ছেলে। খুব বেশি কথা বলত না। কিন্তু প্রিয়ন্তির সামনে এলে তার সমস্ত নীরবতা যেন গল্প হয়ে উঠত। আর প্রিয়ন্তি ছিল প্রাণবন্ত, হাসিখুশি একটি মেয়ে। তার হাসিতে সাফিন নিজের সমস্ত ক্লান্তি ভুলে যেত। প্রিয়ন্তি যখন মন খারাপ করত, সাফিন তার পাশে বসে থাকত। কোনো উপদেশ দিত না, অযথা প্রশ্নও করত না। শুধু বলত, কথা বলতে ইচ্ছে না করলে বলো না। আমি আছি। এই ছোট্ট কথাটুকুই প্রিয়ন্তির কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশ্বাস হয়ে উঠেছিল। একদিন বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুকুরপাড়ে বসে প্রিয়ন্তি বলেছিল, আচ্ছা সাফিন, তুমি কাউকে ভালোবাসলে তাকে কীভাবে বোঝাবে? সাফিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল, তার দুঃখগুলো নিজের কাছে রাখতে চাইব, আর তার হাসিগুলো পৃথিবীর সব মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চাইব। প্রিয়ন্তি মৃদু হেসে বলেছিল, তোমার কথাগুলো খুব সুন্দর। সাফিন তার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, কথাগুলো সুন্দর কি না জানি না। তবে একজন মানুষ আছে, যার জন্য আমার কথাগুলো এমন হয়ে যায়। প্রিয়ন্তির হাসি থেমে গিয়েছিল। তার চোখে জমেছিল এক অদ্ভুত লজ্জা। সে মাথা নিচু করে বলেছিল, মানুষটা কি জানে, তুমি তাকে এতটা ভালোবাসো? সাফিন উত্তর দিয়েছিল, জানে না। জানলে হয়তো আমার এই সুন্দর বন্ধুত্বটুকুও হারিয়ে ফেলব। প্রিয়ন্তি আর কিছু বলেনি। শুধু মনে মনে বলেছিল, বোকা ছেলে, মানুষটা তো তুমিই।


২. ভালোবাসার স্বীকারোক্তি

শীতের এক সকালে প্রিয়ন্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে দেখল, সাফিন আসেনি। সেদিন তার মন কিছুতেই ভালো লাগছিল না। বারবার ফোন করেও সাফিনকে পাওয়া গেল না। বিকেলে সাফিনের একটা বার্তা এল। ‘আজ তোমার সঙ্গে দেখা করতে পারলাম না বলে খুব খারাপ লাগছে। কিছু কথা আছে, যেগুলো তোমাকে না বললে হয়তো কোনো দিনই বলতে পারব না। কাল বিকেলে পুকুরপাড়ে এসো।’

পরদিন প্রিয়ন্তি নির্ধারিত সময়ের আগেই সেখানে পৌঁছে গেল। সাফিন এসে তার পাশে দাঁড়াল। হাতে একটা ছোট্ট ডায়েরি। প্রিয়ন্তি, তোমাকে একটা কথা বলব। শুনে হয়তো তুমি আমার সঙ্গে আর আগের মতো কথা বলবে না।

প্রিয়ন্তি মৃদু হেসে বলল, আগে বলো। তারপর দেখা যাবে। সাফিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমি তোমাকে ভালোবাসি। কবে থেকে ভালোবাসি, জানি না। তোমার হাসি, তোমার অভিমান, তোমার ছোট ছোট স্বপ্ন—সবকিছু আমার জীবনের অংশ হয়ে গেছে। তোমাকে ছাড়া ভবিষ্যতের কথা ভাবতে গেলে আমার সব পরিকল্পনা অসম্পূর্ণ মনে হয়। প্রিয়ন্তির চোখ ভিজে উঠল। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, তুমি এত দিনেও বুঝতে পারোনি, আমিও তোমাকে ভালোবাসি? সাফিন যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সত্যি বলছ?

প্রিয়ন্তি মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ। খুব ভালোবাসি তোমাকে।

সাফিনের মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সমস্ত সুখ বুঝি এক মুহূর্তে তার হাতে এসে ধরা দিয়েছে। সে প্রিয়ন্তির হাত ধরতে চেয়েও থেমে গেল। দুজনেই লজ্জায় হেসে ফেলল। সেদিন আকাশে মেঘ ছিল, বাতাসে শীতের গন্ধ। অথচ তাদের মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর বসন্ত নেমে এসেছে। তারা স্বপ্ন দেখেছিল একসঙ্গে পথ চলার। ছোট্ট একটা বাড়ি হবে, জানালার পাশে বইয়ের তাক থাকবে, সন্ধ্যায় দুজনে চা খেতে খেতে গল্প করবে। প্রিয়ন্তি কবিতা পড়বে, আর সাফিন তার জন্য কবিতা লিখবে। তারা জানত না, কিছু স্বপ্ন মানুষকে সুখ দেওয়ার জন্য আসে না; আসে সারাজীবনের কান্না হয়ে বেঁচে থাকার জন্য।


৩. নিয়তির নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত

প্রিয়ন্তির পরিবার ছিল বেশ রক্ষণশীল। তার বাবা একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর অনেক পরিকল্পনা ছিল। তিনি চেয়েছিলেন, প্রিয়ন্তির বিয়ে হবে এমন একটি পরিবারে, যেখানে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা আছে, সামাজিক মর্যাদা আছে। অন্যদিকে সাফিন ছিল মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। তার বাবা অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক, মা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। সংসারের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি সাফিন পড়াশোনা করছিল। টিউশনি করে নিজের খরচ চালাত, মায়ের ওষুধ কিনত। প্রিয়ন্তি যখন তার বাবাকে সাফিনের কথা জানাল, তখন বাড়িতে যেন ঝড় বয়ে গেল।

— ওই ছেলের কী আছে? নিজের সংসার চালানোর সামর্থ্য আছে? তোমাকে কী সুখে রাখবে?


প্রিয়ন্তি কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, বাবা, সুখ কি শুধু টাকা দিয়ে কেনা যায়? তার বাবা কঠিন গলায় বলেছিলেন, বাস্তব জীবন কবিতার মতো নয়, প্রিয়ন্তি। ভালোবাসা দিয়ে সংসার চলে না। প্রিয়ন্তি অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তার বাবা কোনোভাবেই রাজি হলেন না। বরং জানিয়ে দিলেন, সাফিনের সঙ্গে সব সম্পর্ক শেষ করতে হবে। এদিকে সাফিনও বিষয়টি জানতে পেরেছিল। প্রিয়ন্তির চোখের জল তার সহ্য হতো না। সে জানত, প্রিয়ন্তি পরিবারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারলেও তার জন্য মেয়েটিকে অনেক মূল্য দিতে হবে। একদিন প্রিয়ন্তি বলল, চলো, আমরা বিয়ে করে ফেলি। তারপর যা হওয়ার হবে।


সাফিন অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, তোমাকে নিয়ে পালিয়ে যেতে পারি, প্রিয়ন্তি। কিন্তু তোমার চোখের জল নিয়ে কীভাবে সুখী হব? তোমাকে এমন একটা জীবনে নিয়ে যেতে চাই না, যেখানে প্রতিদিন আমার অসহায়ত্ব তোমাকে কষ্ট দেবে। প্রিয়ন্তি কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমি তোমার কাছে সুখের প্রাসাদ চাইনি। শুধু তোমাকে চেয়েছি। সাফিনের চোখেও জল এসে গেল। জানি। কিন্তু ভালোবাসি বলেই তোমার সব কষ্টের কারণ হতে ভয় পাই। প্রিয়ন্তি সেদিন বুঝেছিল, মানুষ কখনো কখনো ভালোবাসার অভাবে বিচ্ছিন্ন হয় না; বরং ভালোবাসার গভীরতাই তাকে বিচ্ছেদের পথে ঠেলে দেয়।


৪. শেষ দেখা

কয়েক মাসের মধ্যে প্রিয়ন্তির বিয়ের দিন ঠিক হয়ে গেল। ছেলেটি বিদেশে থাকে, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। পরিবারের সবাই খুশি। শুধু প্রিয়ন্তির পৃথিবীটা ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছিল। সাফিনের সঙ্গে তার যোগাযোগও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, বাইরে যাওয়া কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিয়ের তিন দিন আগে অনেক কষ্টে প্রিয়ন্তি সাফিনকে একটি চিঠি পাঠাল। 


‘সাফিন,

জানি না, এই চিঠি তোমার হাতে পৌঁছাবে কি না। আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। সবাই বলছে, আমি নাকি ভাগ্যবতী। কিন্তু তারা কেউ জানে না, আমার ভাগ্য থেকে আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে।


তুমি বলেছিলে, আমাকে কষ্ট দিতে চাও না। অথচ তোমাকে ছাড়া প্রতিটি মুহূর্ত আমার কাছে অসহ্য কষ্টের। তবু তোমাকে দোষ দিই না। জানি, তুমিও ভালো নেই। একটা কথা মনে রেখো, পৃথিবীর কাছে আমি অন্য কারও স্ত্রী হয়ে যাব, কিন্তু আমার হৃদয়ের যে জায়গাটুকুতে তুমি আছ, সেখানে আর কেউ কোনো দিন পৌঁছাতে পারবে না। ভালো থেকো, সাফিন। আমার হয়ে থেকো না, নিজের মতো করে বেঁচে থেকো। ইতি, তোমার প্রিয়ন্তি।’ 


চিঠিটা পড়ে সাফিন অনেকক্ষণ নিশ্চুপ বসে ছিল। তারপর ডায়েরির শেষ পাতায় লিখেছিল, ‘কিছু মানুষকে নিজের করে পাওয়া যায় না। তবু তাদের ভালোবাসা যায়। কিছু সম্পর্কের কোনো সামাজিক নাম থাকে না, কোনো পরিণতি থাকে না। শুধু থাকে অসংখ্য স্মৃতি আর বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস।