২৩তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি, মনসুর আহমদ খান : গৌরবদীপ্ত এক নাম

মো. সফিকুল ইসলাম
মহান একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা মনসুর আহমদ খানকে গভীর অনুরাগে বিন¤্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি। আমরা তাঁকে মনসুর ভাই বলেই ডাকতাম। ২৩ বছর আগে ২০০২ সালে ১২ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেছেন। দেখতে দেখতে এতোগুলো বছর চলে গেল। এভাবে লক্ষ-কোটি অতিবাহিত হলেও মনসুর ভাই আর ফিরবেন না। কিন্তু জীবনকালের কাজ মানুষকে মহান করে—কীর্তিমান করে। মনসুর ভাইয়ের এমনকিছু সৃষ্টি রয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে হারিয়ে যাবেন না, কোনো কালেও। আমাদের সমাজ-সভ্যতা যতদিন বহমান মনসুর ভাইও বয়ে চলবেন সগৌরবে। এই চলা কখনও হবে ক্ষীণ, আবার কখনও হবে দীপ্ত। তাঁর অমরকীর্তি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা। এটি বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক মিউজিয়াম, এই তথ্য আমাদের অনেকেরই অজানা। মনসুর আহমদ খান দেশ-স্বাধীনের পর দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের কাজ শুরু করেন বহুমাত্রিক অবয়বে। বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-সভ্যতা, ভাষাসংগ্রাম, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ সর্বোপরি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জীবনদর্শনে তরুণ প্রজন্মকে প্রেরণা ও চেতনাদীপ্ত করতে তিনি নিজ উদ্যোগেই কাজ শুরু করেন।
মনসুর আহমদ খান প্রবলভাবে বিশ্বাস করতেন, মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণ অবয়ব মিউজিয়ামে সংগ্রহ করলে ১৯৭১-র প্রজন্ম সচেতন হবে এবং বেড়ে ওঠবে প্রবল দেশচেতনায়। সেই উদ্দেশে উদ্যোগী হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করে শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা। ১৯৭৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে এই মিউজিয়ামের উদ্বোধন হয়। মনসুর আহমদ খান উদ্বোধনের দিনই সেখানে যোগদান করেন। কিউরেটর পদে কর্মরত থাকাবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। প্রায় তিন দশক অক্লান্ত পরিশ্রম করে নিজের সব আবেগ ভালোবাসা ও চেতনা দিয়ে মিউজিয়ামকে তিলে তিলে গড়ে তোলেন। মিউজিয়ামকে ঘিরেই তাঁর জীবন আবর্তিত হতো এবং এই মিউজিয়ামকে ঘিরে তাঁর বহু রচনা রয়েছে। মনসুর ভাই ‘মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহী’ গ্রন্থের সম্পাদনা করেন। বলা প্রয়োজন, রাজশাহীর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এটিই প্রথম গ্রন্থ।
১৯৯৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি গ্রন্থটি প্রকাশ করেছিল ঢাকার ‘আগামী প্রকাশনী’। ‘মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহী’ গ্রন্থে তিনি সাহসী ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতাবিরোধী মুসলিম লীগ নেতা আয়েন উদ্দীনের বাড়ি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব কাছে। আয়েন উদ্দীন এই অঞ্চলে মুক্তিকামী সংগ্রামী বাঙালিদের হত্যা ও নির্যাতন করার যে তালিকা প্রতিনিয়ত তৈরি করে পাকসেনা ক্যাম্পে পৌঁছে দিতেন, প্রধানত তার তালিকা ধরেই মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করা হতো। পাকসেনাদের নিকট সরবরাহকৃত আয়েন উদ্দীনের বিভিন্ন পত্র মনসুর আহমদ খান সংগ্রহ করেন এবং এসব পত্র ও দুর্লভ ছবি তিনি তাঁর গ্রন্থে প্রকাশ করেন। তাঁর অপর সম্পাদিত ‘৬৯-এর ডক্টর জোহা’, ‘জীবন্ত শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মজিবুর রহমান দেবদাস’ (যৌথ সম্পাদনা)।
মনসুর আহমদ খান বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী। বহুমুখী কাজ করেছেন। তিনি ছিলেন কুমিল্লার (বর্তমান চাঁদপুর) মানুষ, জন্ম- ২৫ নভেম্বর ১৯৪৭। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থাতেই মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। মুক্তিযুদ্ধ করেছেন চাঁদপুর-ফেনী-চট্টগ্রামে। যুদ্ধে বড় বড় অপারেশনে অংশ নিয়ে পাক বাহিনীকে পর্যদুস্ত করতে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পর জীবন সংগ্রামে নিয়োজিত হন চাঁদপুর ডিগ্রী কলেজে অধ্যাপনার মাধ্যমে। একই সঙ্গে দৈনিক ইত্তেফাকের জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। জড়িয়ে ছিলেন সাংস্কৃতিক কর্মকা-েও। ইত্তেফাকের রোকনুজ্জামান খানের (দাদা ভাই) বিশেষ দূত হিসেবে শিশু সংগঠন কচিকাঁচা শাখা গঠন করতে শিশুবন্ধু মনসুর আহমদ খান রাজশাহীতে আসেন। সংক্ষিপ্ত সফরেই এখানকার মানুষের সারল্য জীবন তাঁকে আকৃষ্ট করে।
অন্তরঙ্গতা সৃষ্টি হয় এখানকার জীবনধারার সঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম তৈরির আর্দশ স্থান মনে করেন রাজশাহীকে। তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধের আরেক পর্ব নিয়ে কাজ করার অদম্য আগ্রহ তো ছিলই। এরই ধারাবাহিকতায় নিজেকে নিয়োজিত করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।
মনসুর আহমদ খান ঐতিহ্যবাহী, সংস্কৃতিমনা ও উচ্চশিক্ষিত পরিবারের সন্তান। তিনি নিজে ভাল ছবিও আঁকতেন। বরেণ্য শিল্পী হাশেম খান তাঁর বড় ভাই এবং অপর ভাই ডা. সুলেমান খান একাত্তরে শহিদ। তাঁর দুই পুত্র সন্তান শুভম ও প্রীতম। ওনারাও শিল্পী। বড় ছেলে শুভম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ছাত্র ছিলেন, এখন শিল্পী। অপরপুত্র ব্যাংকার হলেও ছবি আঁকা ছেড়ে দেননি। আরও বহু শিল্পী এ পরিবারের সদস্য। নিজের আজন্ম শৈল্পিক চেতনা থেকে সুদীর্ঘ সময় ছবি আঁকার স্কুল ‘অংকন’ তিনি রাজশাহীতে পরিচালনা করেছেন। রাজশাহী আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। ওই কলেজে তিনি দুই যুগ অধ্যাপনা (খ-কালীন) করেছেন। সেটিকে পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ হিসেবে আত্মীকরণ করে। আত্মীকরণের সময় তিনি শিক্ষক হিসেবে বিভাগে যোগদানের সুযোগ পেয়েছিলেন। মিউজিয়ামের প্রতি প্রগাঢ় ভালবাসায় তিনি শিক্ষক হওয়ার সুযোগ গ্রহণ করেননি।
আগেই বলেছি মনসুর ভাই হারিয়ে যাবেন না, কোনো কালেও, বয়ে চলবেন সগৌরবে। সেদিন ‘বাতিঘর’ রাজশাহী গ্রন্থাগারে গিয়ে অবাক হলাম। মনসুর ভাইয়ের ‘মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহী’ গ্রন্থটি সাম্প্রতিক সময়ে পুনরায় প্রকাশ করেছে ‘আগামী প্রকাশনী’। যতদিন আমাদের সমাজ-সভ্যতা টিকে থাকবে, ততদিনই বাংলার মুক্তিসংগ্রাম, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এবং মনসুর ভাইয়েরা টিকে থাকবেন ইতিহাসের অনিবার্য অনুসঙ্গ হয়ে। মনসুর আহমদ খানের কর্ম ও সাধনা আমাদের নিত্য প্রেরণা হয়ে থাকুক।
লেখক: উপ-রেজিস্ট্রার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।