শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

শুধু কথা ও শ্লোগানে নয়, চাই বাস্তবে মর্যাদা

WP Import ০৭ অক্টোবর ২০২৫ ০৮:০৬ অপরাহ্ন
WP Import ০৭ অক্টোবর ২০২৫ ০৮:০৬ অপরাহ্ন
শুধু কথা ও শ্লোগানে নয়, চাই বাস্তবে মর্যাদা
শুধু কথা ও শ্লোগানে নয়, চাই বাস্তবে মর্যাদা

আব্দুর রাজ্জাক রিপন:


ক. শিক্ষক শুধু একজন মানুষ নন, তিনি একজন পথপ্রদর্শক, একজন দিকনির্দেশক এবং জাতি তৈরির কারিগর। একজন শিক্ষক তাঁর জ্ঞান, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের মাধ্যমে প্রজন্মকে গড়ে তোলেন। তিনি শিক্ষার্থীদের শুধু বইয়ের অক্ষর শেখান না, বরং জীবনের দর্শন, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ শেখান। শিক্ষকের অবদানই একটি জাতিকে শক্তিশালী, জ্ঞানসমৃদ্ধ ও উন্নত পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। এই কারণেই প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়। এটি ইউনেস্কো ও আইএলও কর্তৃক ঘোষিত একটি আন্তর্জাতিক দিবস। এদিনে শিক্ষক সমাজকে সম্মান জানানো হয়, তাদের অধিকার নিয়ে আলোচনা করা হয় এবং শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন নিয়ে বৈশ্বিক সচেতনতা তৈরি করা হয়। আজকের দিনে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ই-লার্নিং এবং বৈশ্বিক সংকটের সময়েও শিক্ষকরা জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে যাচ্ছেন। তাই বিশ্ব শিক্ষক দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিন নয়, বরং শিক্ষকদের অবদানের স্বীকৃতি ও তাদের মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকারের দিন।
খ. বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের উদ্দেশ্য:

  •  শিক্ষকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, তাদের অবদান ও ত্যাগকে স্বরণ করার জন্য।
  •  শিক্ষা উন্নয়নের জন্য।
  •  শিক্ষকদের অধিকার রক্ষা, সঠিক বেতন, সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য।
  •  নতুন প্রযুক্তি ও ডিজিটাল প্লাটফর্মে শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য।
  •  একটি উন্নত ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য।

গ. প্রতিবছর দিবসটি একটি নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য নিয়ে পালিত হয়। ২০২৫ সালের সম্ভাব্য প্রতিপাদ্য হতে পারে “শিক্ষক সম্মান ও ডিজিটাল যুগের শিক্ষা উন্নয়ন” এর মূল বার্তা হলো ডিজিটাল প্রযু্িক্তর যুগে শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে এবং একইসাথে আধুনিক শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে হবে।
ঘ. শিক্ষকেরা জাতির স্থপতি। তাদের ছাড়া কোনো দেশ উন্নত হতে পারে না। দিবসটি আমাদের স্মরণ করায় যে, সব শিক্ষার্থীকে সমান সুযোগ দিতে হবে। শিক্ষকদের অবদানকে স্বীকৃতি দিলে তারা নতুন উর্দমে কাজ করতে পারেন। দিবসটি শিকা খাতের সমস্যাগুলোকে আলোচনায় আনে। শিক্ষক মানে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ একটি দক্ষ প্রজন্ম গড়ে তোলা।
ঙ. বাংলাদেশে শিক্ষকদের ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা প্রতিটি আন্দোলনেই শিক্ষক সমাজের অবদান রয়েছে। তবে বাস্তবে এখনো শিক্ষকেরা নানা সমস্যায় ভোগেন।

  • পর্যাপ্ত বেতন ও সুযোগ-সুবিধার অবাব
  • ক্লাসে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী
  •  প্রশিক্ষণ ও আধুনিক শিক্ষা প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা
    গ্রামীন এলাকায় শিক্ষার বৈষম্য

প্রতি বছর দিবসটি পালনের সময় বাংলাদেশে শিক্ষক সংগঠনগুলো মানববন্ধন, র‌্যালি, আলোচনা সভা, সেমিনার আয়োজন করে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের সম্মান জানাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শুভেচ্ছা ও উপহার প্রদান করে থাকে।

চ. বিশ্বের উন্নত ও সভ্য দেশগুলোতে শিক্ষকের মর্যাদা অন্যান্য পেশার চেয়ে অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষককে ভিআইপি হিসাবে গণ্য করা হয়, ফরাসি আদালতে কেবল শিক্ষকদের চেয়ারে বসার অধিকার রয়েছে এবং জাপানে শিক্ষককে গ্রেফতারের জন্য পুলিশের অনুমতি নিতে হয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় শিক্ষকদের আই-কার্ড প্রদর্শন করলেই মন্ত্রীর সম অধিকার পাওয়া যায়। ফিনল্যান্ডে টপারদের শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ করা হয়।

ছ. বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে শিক্ষকতার অবস্থা দুৎখজনক। তাদের স্বল্প বেতন, ১০০০/- বাড়ি ভাড়া, ৫০০/- চিকিৎসা ভাতা এবং অবসরের পর এককালীন টাকার জন্য ধুকে ধুকে মরা সত্যিই হতাশাজনক। শিক্ষকের চেয়ারটি এক সময় মর্যাদার প্রতীক ছিল; কিন্তু এখন তা আর নেই। কোনো কর্মকর্তা এসে প্রধান শিক্ষকের চেয়ারে বসে পড়েন এবং শিক্ষককে পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানে চেয়ারটি তার জন্য নির্ধারিত-এটা একটি মৌলিক সৌজন্যবোধের বিষয়। সমাজকে বুঝতে হবে, শিক্ষকের মর্যাদা ও অবস্থান সংরক্ষণ করা জরুরি। বর্তমান সময়ে যেখানে উন্নত অবকাঠামো ও শিক্ষাক্রম রয়েছে, সেখানে শিক্ষকদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানো প্রয়োজন। উন্নত দেশের শিক্ষাপদ্ধতি গ্রহনের পাশাপাশি আমাদের শিক্ষকদের বেতন ও মর্যাদা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রতিটি প্রধান শিক্ষকদের চেয়ারের মর্যাদা রক্ষার জন্য অন্যদের সেখানে বসা উচিত নয়। একটি আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন জাতি গঠনের জন্য শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শিক্ষকের সম্মান ও মর্যাদার প্রতি আমাদের সবার দায়বদ্ধতা রয়েছে।

জ. শিক্ষাঙ্গনে সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে সুন্দর সম্পর্ক তৈরি, দেশব্যাপী শিক্ষকদের অধিকার ও মর্যাদা সুরক্ষা এবং শিক্ষকদের জীবনের মান উন্নত করার ব্যাপারে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের দাবি। একজন শিক্ষক নিজের জ্ঞান-গরিমা, চলন-বলন, নীতি-নৈতিকতায় শুধু নয়, সমাজের দৃস্টিতেও যত উঁচুতে উঠবেন, তিনি তত বড় শিক্ষক হবেন। এতদিন তাই হয়ে আসছে, ভবিষ্যতেও তাই হবে। এটা জানতেন বলেই কবি কাদের নেওয়াজ তার শিক্ষাগরুর মর্যাদা কবিতায় লিখেছিলেন-
“উচ্ছাস ভরে শিক্ষকে আজি দাঁড়ায়ে সগৌরবে
কুর্নিশ করি বাদশাহে তবে কহেন উচ্চরবে-
আজ হতে চির-উন্নত হল শিক্ষাগরুর শির
সত্যই তুমি মহান উদার বাদশাহ আলমগীর।”

শিক্ষকের মর্যাদা সবার উপরে। তাই আমাদের উচিৎ আমাদের শিক্ষাগুরুদের মন থেকে সম্মান করা, তাঁদের মন থেকে ভালোবাসা। আমি আমার সব শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই, যারা আমার শিক্ষাজীবনে আমাকে সর্বদা অনুপ্রাণিত করেছেন। সেই সাথে আমি শ্রদ্ধা জানাই দেশের সব স্তরের শিক্ষকগণের প্রতি, যারা অনেক সীমাবদ্ধতার মাঝেও জাতির ভবিষ্যতের মজবুত ভিত্তি গঠনে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।
লেখক: কবি ও লেখক

razzaqueict74@gmail.com