চলে গেলেন আমাদের নন্দী দা

মো. সফিকুল ইসলাম:
আমাদের সকলের প্রিয় সুলেখক নাট্যকার মনোরঞ্জন নন্দী বেচেঁ নেই! গত পরশু সোমবার বিকেলে নগরীর মতিহার থানাধীন বিনোদপুরের নিজ বাড়িতে ৬৭ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন থেকেই তিনি নানা রোগে ভুগছিলেন। ওনাকে আমরা সংক্ষেপে ‘নন্দী দা’ বলেই ডাকতাম। এই নামে আর কোনোদিনও ডাকা হবে না। রাজশাহীর লেখকসমাজ ও সাংস্কৃতিক জগতে নন্দী দা খুবই নন্দিত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে নগরীর সাংস্কৃতিক ও লেখক মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আমরা গভীরভাবে শোকাভিভূত।
মৃত্যু এক অমোঘ সত্য ঘটনা, তবুও নন্দী দা’র মৃত্যু মেনে নিতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। নন্দী দা পত্রিকায় আমার লেখার অগ্রজ-সঙ্গী পঁচিশ বছর ধরে। বিশেষ দিবসসমূহে ক্রোড়পত্রে আমাদের লেখা একসঙ্গে ছাপা হতো। মহান বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বুদ্ধিজীবী দিবস, জাতীয় শোক দিবস, অমর একুশে ইত্যাদি দিবসের অন্তত পনের দিন আগেই ‘সিগনাল’ পেতাম। ফোন করে মনে করিয়ে দিতেন। বলতেন, ‘কী বিষয়ে শিখবেন দাদা।’ উল্টো জানতে চাইতাম, ‘আপনি?’ বলতেন, ‘আরে দাদা আমি মূর্খ-সূর্খ মানুষ’, ‘আমি আর কী লিখবো।’ এমন বিনয়ী মানুষ আমার জীবনে আর একজনকেও পাইনি। তাঁর ছেলে বয়সীকেও ‘আপনি’ করে সম্বোধন করতেন। তিনি নিজকে সবসময় ধ্যান করতেন নগন্য হিসেবে, কিন্তু আসলে তিনি ছিলেন সবসময় আমাদের কাছে অনন্য।
নন্দী দা এক-সময় নগরীর বোয়ালিয়া থানার মোড়ে থাকতেন। থানার নিকটে মেট্টোপলিটন প্রেসক্লাবে রাতে আমাদের আড্ডা হতো নিয়মিত। সেই আড্ডা ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক। আড্ডার মধ্যে দিয়ে আমরা জ্ঞান আহরণ করতাম। দাদার হাতে কলম আর বলপেন থাকতো। কথার ফাঁকে কী যেন টুকে নিতেন। পরে দেখতাম আড্ডার নির্যাস নিয়ে দীর্ঘ এক লেখা ছেপে দিয়েছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। ভাষা সাবলীল। লেখার সূচনা করতেন চমৎকারভাবে। প্রতিটি বাক্যে এমনভাবে উপস্থাপনা করতেন যেন পাঠককে লেখার শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়। লেখার শেষ প্যারায় একটা ‘ম্যাসেজ’ পাওয়া যেতো। দাদার প্রতিটি লেখাই একেকটি ‘আদর্শ লেখা’। সমাজের নানা অনিয়ম অসঙ্গতি তাঁকে সবসময় পীড়িত করতো, লেখার বিষয়বস্তুও ছিল তাই। নন্দী দা’র প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা সামান্যই। হাই স্কুলের গ-ি অতিক্রম করতে পারেন নি। কিন্তু অধিতবিদ্যার জোরে সুলেখক হয়ে ওঠেন। দেশমাতৃকার প্রতি অসীম দায়বদ্ধতা তাঁকে লেখায় জীবনঘনিষ্ঠ করেছে। প্রখ্যাত কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক স্যারের মত মানুষকে ভরা সেমিনারে নন্দী দা’র লেখার প্রশংসা করতে শুনেছি একাধিকবার।
মনোরঞ্জন নন্দীর তিনটি গ্রন্থ পাঠক নন্দিত। শিশু কিশোরদের জন্য মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্পগ্রন্থ ‘সবুজ দ্বীপের ইতিকথা’ তাঁর প্রথম গ্রন্থ, প্রকাশ একুশে বইমেলা ২০০৫। দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘ভালোলাগা ভালবাসা’ (উপন্যাস) প্রকাশ একুশে বইমেলা ২০০৭, তৃতীয় গ্রন্থ ‘মামার গল্প (শিশু-কিশোর গল্প) প্রকাশ একুশে বইমেলা ২০১০। ‘সবুজ দ্বীপের ইতিকথা’ গ্রন্থে পনেরটি গল্প। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গল্পের মাধ্যমে এমন আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করা যায়, গ্রন্থটি না পড়লে বুঝা যাবে না। গল্পের চরিত্রগুলো হচ্ছে, টিকটিকি, শিয়াল, বাঘ, সারমেয়, প্যাঁচা ইত্যাদি। এই জন্তু-জানোয়াদের মুখ দিয়ে গল্প বলিয়ে অসাধারণভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ফুঁটিয়ে তুলেছেন। আমার দুইকন্যা শিশু বয়সে ‘সবুজ দ্বীপের ইতিকথা’ পড়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি গভীর অনুরাগী হয়েছেন। নন্দী দা একজন খ্যাতিমান নাট্যাকার ছিলেন। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ বেতার রাজশাহী কেন্দ্রে নাট্যকার হিসেবে তালিকাভুক্তি এবং এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি প্রথম শ্রেণির নাট্যকারের মর্যাদা লাভ করেন। নাটকের সংখ্যা প্রায় ত্রিশ। রাজশাহী বেতার ছাড়াও তাঁর বহু নাটক আন্ত ট্যান্সমিশনের অধীনে ঢাকা, খুলনাসহ অপর কেন্দ্রেও সম্প্রচারিত হয়েছে। বেতারের জন্য তিনি বহু জীবন্তিকাও লিখেছেন। নন্দী দাদা ১৯৭৫ সালের ১০ অক্টোবর রাজশাহীস্থ সহকারী হাইকমিশনে স্থানীয় স্টাফ হিসেবে তিন দশকেরও বেশি সময় চাকরি করেন। নন্দী দা ১৯৫৮ সালের ১ জুন নাটোর শহরের হাজরায় জন্মগ্রহণ করেন মামার বাড়িতে, পৈত্রিক নিবাসও নাটোর শহরে।
মনোরঞ্জন নন্দী দাদা বিলিয়ে দিয়েই সুখ পেতেন। খুবই পরোপকারী ও বন্ধুবৎসল একজন মহৎপ্রাণ বাঙালি। প্রিয়জনদের প্রায়শই নিমন্ত্রণ করে বাড়িতে নিয়ে খাওয়াতেন। আমরা বোয়ালিয়া থানার মোড়ে আড্ডার পর বিপ্লবের দোকানে চা-নাস্তা করতাম। প্রতিদিনই তিনি আগে পকেটে হাত ঢুকাতেন বিল দেওয়ার জন্য। আমরা রাগারাগি করতাম, কিন্ত লাভ হতো না। কর্মসূত্রে ছোটবেলা থেকেই রাজশাহীতে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী বিথীকা নন্দী, দুইপুত্র বিভাস নন্দী মিঠু, পরাগ নন্দী, পুত্র বধু, এক নাতি (পৌষাম নন্দী বুবাই) ও বহু গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। নন্দী দা আমাদের প্রাণের মানুষ। গভীর অনুরাগে তাঁকে নিত্যই স্মরণ করবো।
লেখক: উপ-রেজিস্ট্রার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।