শিলাইদহ কুঠিবাড়ী দর্শন ও একটি করুণ মৃত্যু

ড. এ.এইচ.এম. জেহাদুল করিম:
বেশ অনেকটাই আগের কথা; আমি তখন, সবেমাত্র এসএসসি পরীক্ষা সম্পন্ন করেছি। আমার পিতার চাকুরীর সুবাদে ১৯৬৫ সালের সেই সময়টিতে, আমরা কুষ্টিয়া শহরের বিখ্যাত মোহিনী মোহন কটন মিলস লিমিটেড সংলগ্ন একটি হিন্দু অধুষ্যিত এলাকায় সরকার অধিকৃত একটি বাড়ীতে বসবাস করতাম। শুল্ক বিভাগের একজন অফিসার হিসেবে, আমার পিতার অধীনে মোহিনী মিলস্ সহ কুষ্টিয়ার আরও কিছু শিল্পস্থাপনার উৎপাদনে শুল্ক-ধার্যকরণ এবং সংগ্রহণের মূল দায়িত্বটি ছিল তাঁর। ১৯০৮ সালে, গড়াই নদীর এপারে একশত একর জমির উপর কুষ্টিয়ায় স্থাপিত মোহিনী মিলসটি তৎকালীন বৃটিশ আমল থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে তথা বৃহত্তর এশিয়ায়, কাপড়-শিল্প উৎপাদনে একটি অনন্য স্থান করে নিয়েছিল। গড়াই নদীর ওপারে শিলাইদহ এলাকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জমিদারী। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কুষ্টিয়া শহরের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী বাবু জগৎ কিশোর চৌধুরীর আর্থিক সহযোগিতায়, মোহিনী বাবু কুষ্টিয়ায় এই বিখ্যাত শিল্পটি গড়ে তোলেন। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর, মোহিনী বাবু উক্ত কটন মিলসটি তাঁর জেনারেল ম্যানেজার কানু বাবুর হাতে অর্পণ কুের কোলকাতা গমন করেন। তৎপরবর্তী সময়ে, বিভিন্ন পর্যায়ে ধাপে ধাপে এই শিল্পটি সম্পূর্ণ ধ্বংস প্রাপ্ত হয়।
আমার এই আলোচনার প্রাসঙ্গিকতা ও কেন্দ্রবিন্দু মূলতঃ আমার জীবনের প্রারম্ভিক সময়টিতে শিলাইদহের রবীন্দ্র-কুঠিবাড়ী দর্শনের একটি পূর্ণাঙ্গ স্মৃতি-বিশ্লেষণ। আগেই ইঙ্গিত করেছি যে, মোহিনী মিলস সংলগ্ন মিলপাড়াটি উক্ত ইন্ডাষ্ট্রিয়াল প্ল্যান্টে চাকুরীরত মূলত হিন্দু অফিসার ও ষ্টাফদেরই বাসস্থান ছিল। স্বভাবতঃই, আমার পিতার মত দুই-এক ঘর মুসলিম সরকারী অফিসার ছাড়া সকলেই ছিল আমাদের ঘনিষ্ট হিন্দু প্রতিবেশী। স্বাভাবিকভাবেই, আমার বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে সকলেই ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী যা আমাকে শৈশব থেকেই ধর্মীয় গোঁড়ামীর বাইরে, পরধর্মগ্রাহ্যতা ও পরমতসহিষ্ণুতার মনোভাব ধারণ করতে সহায়তা করে।
মার্চ-এপ্রিলে এসএসসি পরীক্ষা সম্পন্ন করে, মিলপাড়ায় বসবাসকারী আমিসহ আমাদের ছয় বন্ধু সকলেই গড়াই নদী পার হয়ে পদ্মা তীরের শিলাইদহে অবস্থিত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ী দর্শনের সিদ্ধান্ত নেই। কুষ্টিয়া শহর থেকে শিলাইদহ যাবার জন্য তখন গড়াই নদীতে কোন ব্রীজ ছিল না। আমরা ছয় বন্ধু, নৌকার ফেরীতে ৩টি সাইকেল নিয়ে ৭/৮ কিলোমিটারের মেঠোপথ ধরে কুঠিবাড়ী দর্শনে যাত্রা করি। বৈশাখের শেষ এবং বর্ষার প্রারম্ভিক পর্যায়, তাই অপ্রত্যাশিতভাবে আকাশ থেকে থেকেই মেঘাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। কুঠিবাড়ী যাত্রার সেদিনটিতেও, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হতে থাকে। সবকিছু উপেক্ষা করেই শেষ পর্যন্ত আমরা আমাদের গন্তব্যস্থল, কুঠিবাড়ীতে পৌঁছে যাই। সমগ্র দিনটি সেখানে অতিবাহিত করে, পড়ন্ত বিকেলের প্রথমার্ধে পুনরায় কুষ্টিয়া শহরে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে আসবার জন্য রওয়ানা দিই।
পদ্মা নদীর কোল ঘেঁষে শিলাইদহ গ্রামটি ইউরোপের ম্যানরিয়াল হাউজের আদলে, জমিদারির বাসস্থান হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, যা প্রকৃতিগতভাবেই বেশ আকর্ষণীয়। শিলাইদহ থেকে কিছুটা দূরের গ্রামগুলো হলো- কয়া, হবিপুর ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনেক কবিতা, গান ও গল্পেরই পটভূমি বাংলাদেশের শিলাইদহ, শাহাজাদপুর ও পতিসরের এইসব গ্রামীণ স্পটগুলো। তাঁর রচিত ‘সোনারতরী’, ‘কথা ও কাহিনী’, ‘চিত্রা’ ইত্যাদি বিভিন্ন লেখা শিলাইদহে বসেই লেখা। এমন নিরবচ্ছিন্ন পরিবেশে রবীন্দ্রনাথের কবিতার বেশাংশও শিলাইদহতেই ইংরেজীতে অনুদিত হয়; যারই ফলশ্রুতিতে, রবীঠাকুর ১৯১২ সালে নোবেল প্রাইজ অর্জন করেন।
সারাদিন শিলাইদহে কাটিয়ে বিকেলে আমরা যখন কুষ্টিয়ায় ফিরে আসছি, ঠিক তখনই শুরু হয় বৈশাখী ঝড়। জনমানবহীন এই সাত কিলোমিটার রাস্তায় আমরা ছয়জন ছাড়া তেমন কোন প্রাণীই চোখে পড়েনি। কিছুটা ভীত হলেও, হাল ছাড়ার কোন উপায় ছিল না। তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের শুরু। বৈশাখের প্রথম পূর্ণিমার রাত্রির ঝড়ো হাওয়া ও মেঘের কারণে, পূর্ণিমার চাঁদ অমাবশ্যার মত ঢেকে গেছে। প্রচন্ড ঝড়ে বিজলীর আলোকের প্রতিফলনে পথ চলতে চেষ্টা করছি, অবশেষে অনেক খোঁজাখুঁজির পর আমাদেরই এক বন্ধু নিতাই ঘোষের হরিপুরস্থ নদীপারের বাড়ীতে উপস্থিত হলাম। এমনি বিপদসংকুল আবহাওয়ায় নদী পারাপার সমুচিত হবেনা বিধায় আমরা ছয় বন্ধুই নিতাইয়ের বাড়ীতেই রাত্রি যাপন করলাম। নিতাইয়ের দাদা মোহিনী মিলসে চাকুরী করতেন এবং দুর্ভাগ্যবশত:, রাতের শিফটেই অত্যন্ত জরুরীভাবে তাকে কাজে যোগ দিতে হবে। এখানে উল্লেখ্য যে, আমরা ছয় বন্ধু তারই সাথে, রাতে বাড়ী ফিরতে চাইলে প্রচ- ঝড়ের কারণে তিনি আমাদের বাধা দেন। পরদিন ভোরে প্রকৃতি শান্ত হবার পর আমরা নদীতীরে খেয়া পার হয়ে কুষ্টিয়া যাবার জন্য প্রস্তÍÍতি নিচ্ছি, ঠিক তখনই জানতে পারলাম যে গত রাতে গড়াই নদীতে এক অনাকাঙ্খিত নৌকাডুবি হয়েছে এবং তাতে দু’জন লোক মারা গেছেন, যাদের একজনই হলো নিতাইয়ের দাদা। ঘটনাটি শুনে আমরা যেমন স্তম্ভিত হয়ে গেলাম, তেমনি আমাদের হৃদয় বেদনায় জর্জরিত হয়ে উঠলো।
(লেখক: প্রফেসর ড. এ. এইচ. এম. জেহাদুল করিম। প্রাক্তন উপাচার্য, কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়; রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক এবং বর্তমানে Adjunct Professor, North South University, ঢাকা, বাংলাদেশ)