শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

ট্রান্সজেন্ডার গল্পজ্ঞান

WP Import ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:৩১ পূর্বাহ্ন
WP Import ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:৩১ পূর্বাহ্ন

দুলাল আলম


বায়োস এবং লগোস এই দুটি গ্রিক শব্দ সমন্বয়ে বায়োলজি শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। বায়োস (নরড়ং) অর্থ জীবন এবং লগোস (ষড়মড়ং) অর্থ জ্ঞান। জীববিজ্ঞান বা বায়োলজিতে জীব সম্পর্কীয় জ্ঞান পরিপূর্ণরূপে আলোচনা করা হয়। বায়োলজি বা জীববিজ্ঞানে জীবের ক্রমবর্ধমান উৎপত্তি, বিকাশ, কোষের ভেতরে অবস্থিত বিভিন্ন উপাদান সমূহের কার্যকারিতা, গুনাগুন, উপাদান, গাঠনিক স্ট্রাকচার ইত্যাদি বিষয়ে আলোকপাত করে জীবনের সহজলভ্যতাকে সুনিশ্চিতভাবে সমন্বিত রূপকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে জীবনযাত্রায় প্রত্যাশিত স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাস্তবতার নিরিখে উপযোগিতার গঠন, মাইটোসিস, মিয়োসিস পদ্ধতিতে কোষ বিভাজন, বিপাকীয় পদ্ধতি বিভিন্নভাবে বিশ্লেষিত বিষয়বস্তু উপস্থাপিত হয়ে থাকে।

মানুষের বৈজ্ঞানিক নাম হোমো স্যাপিয়েন্স। হোমো অর্থ মানুষ, স্যাপিয়নস অর্থ জ্ঞান। মানুষ জ্ঞানী, সে জ্ঞান অন্বেষণের মাধ্যমে তার বংশীয় ধারাকে আদিকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত সুচারুরূপে প্রয়োজনীয়ভাবে জীবনকে সমৃদ্ধ করে এবং বংশগত ধারাকে অব্যাহতভাবে অগ্রগামী করে।

মনস্তাত্ত্বিকভাবে তার চাহিদার সত্তাকে স্বকীয় ধারায় উন্নতকরণের মাধ্যমে নিজস্ব আবেগ অনুভূতি ও ভালো লাগার ভূতনতুনত্বের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে এবং জীবনযাত্রাকে নতুন মাত্রা দিতে পারে ।
সৃষ্টির আদি মূল নারী ও পুরুষ বিপরীতার্থক সেক্সে আকৃষ্ট হয়ে বংশানুক্রমিক ধারার ভেতর দিয়ে প্রবর্তিত হয়ে আজ পর্যন্ত মানবজাতির ক্রমবৃদ্ধিমান সৃষ্টিবাদকে অব্যাহতভাবে আবর্তন করছে। স্থান, কাল, পাত্র ভেদে মানুষের গাঠনিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অভিযোজনের মাধ্যমে পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে চলার সামর্থ্য অর্জনে প্রতিকূল বা অনুকূল আবহাওয়াকে নিয়ে স্ববংশধারাবাদ্যকে গ্রথিত করেছে। সাদা, কালো, লাল, গৌরবর্ণ খর্বাকৃতি বা দীর্ঘ দেহি তার উচ্চতার আনুপাতিক হার সঠিকবৃত্তে মাইটোসিস ও মিয়োসিস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শরীরবৃত্তীয বৃদ্ধি ও সত্তাকে প্রকাশ করছে টিকে থাকার পরিক্রমায়।

বংশগতিধারার জন্য নারী পুরুষের মিলন অপরিহার্য হতে পারে। টেস্টটিউব বেবি কিংবা ক্লোন বেবি যেখানেও ডিম্বাণু শুক্রাণু-এর মিলনের অপরিহার্যতা রয়েছে। ইস্টোজেন বা টেস্টোস্টেরন, প্রোজেস্টেরন মানব দেহে হতে যথাক্রমে নারী ও পুরুষের ভেতর দিয়ে তৈরি হয়ে বংশধারাকে অব্যাহত রাখে।
ডেভিড রেইমার কেসে সেক্স ও জেন্ডার আইডেন্টিটির বিতর্কিত পরীক্ষা চালিয়ে পুরুষকে নারী হিসেবে এবং নারীকে পুরুষ হিসেবে কল্পনা প্রসূত ভাবধারার নিরীক্ষার প্রয়াস চালান হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক উপায়ে প্রাপ্ত মানুষের লিঙ্গকে অর্থাৎ জন্মগত লিঙ্গে আসল পরিচয় না ধরে তার আচরণগত চাহিদার ভিত্তিতে জেন্ডার পরিচয় হিসেব গ্রহণ করেলে এক্ষেত্রে জন্মগতভাবে প্রাপ্ত নারী ও পুরুষ তার আচরণিক চাহিদাকে লিঙ্গ সমান হিসেবে অপরিহার্যভাবে ধরা হয় না, কল্পনাপ্রসূত চাহিদাই তার বাস্তব লিঙ্গ পরিচালক হিসেবে ধরা হয়।

ট্রান্সজেন্ডার শব্দটি প্রকৃতপক্ষে দুইটি শব্দ ট্রান্স ও জেন্ডার- এই দুটি শব্দ নিয়ে গঠিত হয়েছে। জেন্ডার অর্থ লিঙ্গ আর ট্রান্স অর্থ পরিবর্তন অর্থাৎ জন্মগতভাবে কোন নারী বা পুরুষ তার নির্দিষ্ট আচরণ হতে নির্দিষ্টভাবে সরে গিয়ে বিপরীত লিঙ্গের আচরণকে জীবন যাপনে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ লাভ করে। জেন্ডার ব্যক্তির জন্মগত লিঙ্গবোধ মানসিক আচরণগত লিঙ্গবোধ হতে আলাদা।

ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তির অধিকার আইনে বলা হয়েছে -,
আপাতত বলবত অন্য আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন এ আইনের উদ্দেশ্য পূরণকালে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিকে সম্পত্তির অধিকার হইতে বঞ্চিত করা যাইবে না কিংবা ধর্ম অনুসারে তাহার জন্য সম্পত্তির উত্তরাধিকার নি¤œ বর্ণিতভাবে নির্ধারিত হইবে।
ক) ট্রান্স জেন্ডার ম্যান এর জন্য উত্তরাধিকার অংশ পুরুষের অংশের অনুরূপ হইবে। ট্রান্স জেন্ডার উইমেনের জন্য উত্তরাধিকার অংশ নারীর অংশের অনুরূপ হইবে। এ মতবাদে মনস্তাত্ত্বিক লিঙ্গবোধ জন্মগত লিঙ্গবোধ থেকে ভিন্ন।

খ) শারীরিক গঠনে সুস্থ কোন পুরুষ তার মানসিক আচরণগত চাহিদার ভিত্তিতে নিজেকে নারী বলে প্রমাণ করলে সে নারী আর কোন সুস্থ স্বাভাবিক নারী যদি তার মানসিক আচরণগত চাহিদা অনুযায়ী পুরুষ হিসাবে দাবি করে তবে সে পুরুষ বলে বিবেচিত হবে, এরূপ পুরুষকে ট্রান্স পুরুষ এবং এরূপ নারীকে ট্রান্স নারী বলে। এজন্যে নারী পুরুষের হরমোন দায়ী নহে। সার্জারির মাধ্যমে নারী পুরুষের অঙ্গ চেঞ্জ করা ট্রান্স নারী বা ট্রান্স পুরুষের জন্য আবশ্যকীয় নয়। ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি হওয়া অপপ্রকৃতিস্থ কিংবা হিজড়া বা প্রতিবন্ধী হওয়া আবশ্যকীয় নয় ।

গ) হিজরা হলো শারীরিকভাবে জন্মগত হিসাবে ত্রুটিপূর্ণ ব্যক্তি, আর ট্রান্সজেন্ডার হলো মনস্তাত্ত্বিকভাবে পরিপূর্ণ লিঙ্গবোধ। তথ্য অনুসারে জন্মগতভাবে প্রাপ্ত শারীরিক পরিচয় তার সঠিক পরিচয় নয়, মানসিক আচরণগত পরিচয়ই সঠিক পরিচয়।
ট্রান্স জেন্ডার ব্যক্তির পরিচয় বুঝাবে, কোন ব্যক্তি পূর্বাঙ্গ নারী বা পুরুষ, যার জন্মকালে লিঙ্গবৈচিত্র বহির্লক্ষিত হবার কারণে যাহার লিঙ্গ নির্ধারণ করা সম্ভব হয় নাই, এমন ব্যক্তি যিনি নিজেকে জেন্ডার নৈব্যক্তিক অনুভব করেন।

শারীরিক, মানসিক ও আচরণগত বা মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার রূপান্তরের ফলে যাহার প্রকাশভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে বা হিজরা আলতাভুক্ত নয় ।
অনেক রূপান্তরকারী পুরুষ অস্ত্রপচার বা হরমোনে রূপান্তর বা উভয়েরই লিঙ্গ পরিবর্তন চিকিৎসা নিয়ে প্রত্যাশিত অঙ্গ ধারণ করে, তৃতীয় লিঙ্গের অন্তর্ভুক্ত বিপরীত লিঙ্গের পোশাকে সজ্জিত করে, রূপান্তরিত লিঙ্গের প্রকাশ করে, লিঙ্গ তাদের মানসিক ও আচরণীয় যা তাদের জন্মগত লিঙ্গ চিহ্ন হতে বিপরীত, অনেকে পুরোপুরি পুরুষ বা নারীসুলভ নয় দৈতলিঙ্গের অনুরূপ। কোন পুরুষের ভিতর যদি নারী হরমোন বেশি থাকে তবে তিনি ট্রান্স উইমেন এবং কোন নারীর ভেতরে যদি পুরুষ হরমোন বেশি থাকে তবে তিনি ট্রান্স ম্যান হিসাবে প্রচ্ছন্নভাবে ও প্রকটভাবে প্রকাশ পান ।

যখন কারো জন্মগত লিঙ্গ পরিচয় এবং বাস্তব লিঙ্গ পরিচয়ের মধ্যে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয় তাকে ট্রান্সজেন্ডার বলে। জন্মের সময় যে লিঙ্গ ধারণ করে তাকে বলে প্রকৃতগত বা জন্মগত লিঙ্গ। ট্রান্স জেন্ডার, হিজরা, লিঙ্গ প্রতিবন্ধী, কৃত্রিম লিঙ্গ ধারণকারী মানব জাতিভুক্ত মানুষের প্রতি সহনশীল আচরণ একান্ত প্রয়োজন।

ট্রান্সজেন্ডার অথবা এ রকম ব্যক্তিত্বকে তাদের চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশি আইন কানুন অনুসারে স্বাবলম্বী করার জন্য ব্যাংক লোন হতে শুরু করে পেশাভিত্তিক যাবতীয় সুবিধা প্রদান করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূলধারায় নিয়ে আসা অপরিহার্য। যাতে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে তারা অনেক বড় ভূমিকা রেখে দেশকে স্বাবলম্বন ও উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
লেখক: মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, দুর্গাপুর, রাজশাহী।