শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা: অবিচল অস্তিত্বের সংগ্রাম

WP Import ১৪ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৫১ অপরাহ্ন
WP Import ১৪ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৫১ অপরাহ্ন

মায়িশা জেরিন খান:


‘সুমুদ’ একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো অবিচলতা এবং সহনশীলতা। ফিলিস্তিনিদের অহিংস প্রতিরোধের মূল ধারণা হলো এই ‘সুমুদ’, যা ‘বেঁচে থাকার মাধ্যমেই প্রতিরোধ’-এই দর্শনকে তুলে ধরে। গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা শুধু গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার একটি অভিযান ছিল না, বরং এটি ছিল ইসরায়েলের নৌ-অবরোধ ভেঙে সমুদ্রপথ উন্মুক্ত করার সরাসরি প্রচেষ্টা।

জুলাই ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক নাগরিক সমাজ ও কর্মীদের উদ্যোগে এই গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার যাত্রা শুরু হয়। এটি কোনো রাষ্ট্র-কর্তৃক পরিচালিত অভিযান ছিল না। অক্টোবর ২০২৫-এ পরিচালিত এই অভিযান ছিল এ যাবৎকালের মধ্যে সর্ববৃহৎ। এতে বিশ্বের প্রায় ৪৭টি দেশ থেকে আসা শত শত কর্মী, সংসদ সদস্য এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহ ৪০টিরও বেশি বেসামরিক জাহাজ অংশ নেয়।

জাহাজগুলো আটক করে সেগুলোর মালামাল আশদোদ বন্দরে সরিয়ে নেওয়ার কারণে ফ্লোটিলাটি গাজার নৌ-অবরোধ ভাঙতে বা সমুদ্রপথে সরাসরি সহায়তা পৌঁছে দিতে সফল হয়নি।
ইসরায়েল তাদের এই আটকের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলছে, ত্রাণসামগ্রী অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত চ্যানেল বা অনুমোদিত পথের মাধ্যমে প্রবেশ করতে হবে। তাদের দাবি, এগুলোই গাজায় সাহায্য প্রবেশের বৈধ ও সুরক্ষিত উপায়, যাতে তা হামাসের হাতে না পৌঁছায়। তবে, আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর দেওয়া বিপুল সংখ্যক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, এই ‘প্রতিষ্ঠিত পথগুলো’ পদ্ধতিগতভাবে অপর্যাপ্ত, ইচ্ছাকৃতভাবে বাধাপ্রাপ্ত এবং চরম ঝুঁকিপূর্ণ, যার ফলে গাজার বিভিন্ন অংশে বিপর্যয়কর মানবিক পরিস্থিতি ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। এদিকে, আটক করা সেই ত্রাণসামগ্রী এখন পর্যন্ত গাজার জনগণের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে কিনা, সে বিষয়েও কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা আটকের পর ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে আটক হওয়া কর্মীদের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি দুর্ব্যবহার এবং আটকাবস্থার পরিবেশ নিয়ে নানা অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অভিযোগগুলোকে ‘নির্লজ্জ মিথ্যা’ বলে তীব্রভাবে অস্বীকার করেছে এবং দাবি করেছে যে আটককৃত সকল কর্মীর আইনি অধিকার সুরক্ষিত রাখা হয়েছে।
প্রথম ধাপের ফ্লোটিলা আটকের পরপরই এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে ‘ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন’-এর দ্বিতীয় ধাপের বহর, ‘কনসায়েন্স’ (ঈড়হংপরবহপব) জাহাজটি যাত্রা শুরু করে। এই বহরে বাংলাদেশ থেকে প্রথম যোগ দেন বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যম সংগঠক, ফটোসাংবাদিক, লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট শহিদুল আলম।

তিনি ফিলিস্তিন সময় অঞ্চলে প্রবেশের আগে তাদের সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, তারা সকল বাধা পেরিয়ে গাজায় পৌঁছাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি যেকোনো বেআইনি বাধা অতিক্রম করতে এবং ‘যে কোনো ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত’ বলে ঘোষণা দেন। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, ৮ অক্টোবর, ২০২৫-এর সকালে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ফ্ল্যাগশিপ জাহাজ ‘কনসায়েন্স’ সহ বহরের নয়টি জাহাজই আটক করে।

পরবর্তীতে, তুরস্ক সরকারের সহায়তায় তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয় এবং দেশে ফেরার পর শহিদুল আলম জানান ফিলিস্তিনিরা দিনের পর দিন যে অকথ্য নির্যাতনের মুখে আছেন, তার তুলনায় তাদের (ফ্লোটিলা কর্মীদের) উপর হওয়া এই নিপীড়ন তুচ্ছ মাত্র। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, যেহেতু গাজা এখনও মুক্ত হয়নি, তাই ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্য তাদের সংগ্রাম ও কাজ অবশ্যই চালিয়ে যেতে হবে।
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা থেকে ইসরায়েলের হাতে আটক হয়ে মুক্তির পর এথেন্সে পৌঁছে জলবায়ু কর্মী গ্রেটা থানবার্গ এই অভিযানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘এই অভিযানের অস্তিত্ব থাকাটাই লজ্জার!’ ফ্লোটিলা আটক করে গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানো ঠেকিয়ে দেওয়ায় তিনি ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের তীব্র নিন্দা জানান। মূলত, মুক্তির পর তিনি তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার চেয়ে বরং তাৎক্ষণিক মানবিক ও রাজনৈতিক সংকটের দিকে আন্তর্জাতিক আলোচনাকে ফিরিয়ে আনেন।

ফ্লোটিলাটি গাজায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হলেও, এটি বিপুল আন্তর্জাতিক সমর্থন এবং জনদৃষ্টি আকর্ষণ করতে সফল হয়। এর মূল কারণ, এই অভিযানটি ছিল নিছক কোনো পণ্য সরবরাহের যৌক্তিক কাজ নয়, বরং নাগরিক প্রতিরোধের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ এবং নৈতিক সাক্ষ্যদান। এটি সরাসরি যুদ্ধবিরতির কারণ না হলেও, ফ্লোটিলাটি এমন এক সংকটময় মুহূর্তে ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক জনমত ও চাপ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যখন যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা চলছিল।