গাজায় ট্রাম্পের শান্তি ঘোষণা, শান্তির সম্ভাবনা আসবে!
গাজায় দুই বছর ধরে চলা ব্যাপক প্রাণক্ষয়ী ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ১৩ অক্টোবর ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করে ট্রাম্প বলেন, ‘আকাশ শান্ত, বন্দুকগুলো নিশ্চুপ, সাইরেনগুলো নিশ্চল হয়ে আছে আর পবিত্র ভূমিতে সূর্যোদয় হয়েছে যেখানে অবশেষে শান্তি বিরাজ করছে।’ দারুণ কাব্যিক ছন্দময় ট্রাম্পের এ বক্তব্য। কার না ভাল লাগবে! বিষয়টি তেমনই, যেমনটি বলছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনান্ড ট্রাম্প? কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাস তা বলে না। বরং এটাই যুক্তিযুক্ত যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি পদক্ষেপ শুধুই তাদের স্বার্থ সুরক্ষার কঠোর ও নির্মম অধ্যায়ের কাহিনি। আমেরিকার পৃষ্ঠপোষকতায় উন্নয়নকামী কোনো দেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়েছে কিংবা সেই দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে এমন একটিও উদাহরণ পাওয়া যাবে না। গাজার শান্তি ঘোষণার চলমান অধ্যায়টি বিশ^ রাজনীতিরই চাতুরতাপূর্ণ একটি অংশ। সেখানে স্পষ্টতই আমেরিকা ও ইসরায়েলের স্বার্থ সুরক্ষা হয়েছে। এটি আপাত একটি পরিস্থিতি যা পরিস্থিতির নিরিখে সৃষ্টি করা হয়েছে, যার কোনো ভবিষ্যত নেই। শান্তি-ভাবনা যদি ঝুলিয়ে রেখে শান্তির কৃতিত্ব দাবি করা হয়- তা করা যেতেই পারে; তবে তা শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় কতটুকু স্থায়িত্ব পাবে সেটা প্রশ্নবিদ্ধ।
এটা তো ঠিক যে, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের একটা স্থায়ী সমাধানের সম্ভাবনা দ্বি-রাষ্ট্র ভাবনার মধ্যেই নিহিত আছে। উন্নত দেশগুলোর অনেকগুলোয় তেমনটি ভাবছেন। যে নিরিখে ওইসব দেশ ইতোমধ্যে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্ত্র ট্রাম্পের শান্তি ঘোষণায় দ্বি-রাষ্ট্রের ভাবনা মোটেও গ্রাহ্য হয়নি। মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও তিনি ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার দাবির পক্ষে কিনা তা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তার এই অস্বীকৃতিই বলে দেয় তার শান্তি ঘোষণা মোটেও সম্পূর্ণ কোনো সমাধানের উদ্যোগ নয়। বরং পরিস্থিতিকে একটি ফ্রেমের মধ্যে এনে পৃথিবীর মানুষকে শান্তির ঘোষণা শোনানো মাত্র। এটাকে চমক সৃষ্টির সাথে তুলনা করা যেতে পারে। আরো একটি বিষয়- ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধরত সশস্ত্র হামাস গোষ্ঠি অস্ত্র সম্বরণের বিষয়টিও শান্তি ঘোষণা বা চুক্তির মধ্যে উল্লেখিত হয় নি। বাহ্যত যেটা হয়েছে, এই শান্তিচুক্তির মধ্য দিয়ে গাজাবাসী অনেকটাই স্বস্তি ফিরে পেয়েছেন। অন্তত কিছু সময়ের জন্য তাদের অকাতরে মরতে হবে না। একটু শান্তির শ্বাস নিতে পারবে। যদিও গাজার ৮০ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে স্বস্তি খুঁজে পাওয়াটাও খুব সহজ কাজ হবে না। আর যে টা হয়েছেÑ উভয় দেশের বন্দিরা ইতোমধ্যে মুক্তি লাভ করেছে। এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে স্থায়ী শান্তির সন্ধান মিলবে, এমনটি ভাবা যায় না। শান্তি-সমঝোতা হতে হবে মর্যাদা ও জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষার দৃঢ় অঙ্গীকারের ভিত্তিতে। আর এর জন্য প্রয়োজন দ্বি-রাষ্ট্রের যে যৌক্তিক দাবি সেটাকে গ্রাহ্য করা, বাস্তয়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করা। কোনো জাতিসত্তাকে পরাধীন রেখে, হত্যা-নির্যাতন চালিয়ে শান্তি যুৎসই করা যাবে না। পথটা দ্বিরাষ্ট্র বাস্তবায়নের দিকেই বেশ প্রশ^স্ত। শান্তি-সমঝোতার জন্য সেদিকেই যেতে হবে। নতুবা বিষয়টি ‘শান্তি শান্তি’ খেলার নামান্তর হবে। শান্তির নাগাল মিলবে না।