শনিবার, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬
বরেন্দ্রের ‘অতি উচ্চ পানি-সংকটাপন্ন’ এলাকায় সেচ-নিষেধাজ্ঞা

নিষেধাজ্ঞা-পরবর্তী আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি নিরূপণের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৩৪ পূর্বাহ্ন বরেন্দ্রর জীবন ও বৈচিত্র্য
নিজস্ব প্রতিবেদক ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৩৪ পূর্বাহ্ন
নিষেধাজ্ঞা-পরবর্তী আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি নিরূপণের দাবি

বরেন্দ্রের তিন জেলার ‘অতি উচ্চ পানি-সংকটাপন্ন’ এলাকার সেচ নিষেধাজ্ঞা-পরবর্তী আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি নিরূপণের দাবি উঠেছে। পর্যবেক্ষণ দলের তথ্য থেকে জানা গেছে, পানি-সংকটাপন্ন এলাকায় সেচ নিষেধাজ্ঞার ফলে বহুমাত্রিক সমস্যা দেখা দিয়েছে এবং আগামীতে নতুন নতুন সমস্যা দেখা দিতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই এলাকার খেত মজুররা কর্মহীন হয়ে পড়ছে। একই সাথে এলাকার দরিদ্র মানুষের মধ্যে নিষেধাজ্ঞাজনিত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষেরা বলেছেন, সেচ নিষেধাজ্ঞা খুবই আকস্মিক হয়েছে এবং বিকল্পগুলো নিয়ে বিবেচনার সুযোগ ছিল। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞার  জীবন-জীবিকার ওপর  কী ধরনের প্রভাব পড়বে তা যাচাই করে দেখা হয় নি। ফলে ইতোমধ্যেই ওই নিষেধাজ্ঞা এলাকার সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।


এই জানুয়ারির পাঁচ তারিখে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) রাজশাহী জেলা শাখা এবং রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের আট সদস্যের একটি দল রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর তিনটি উপজেলার পানি সংকটাপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করে তাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। এই দল নিষেধাজ্ঞার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা-পরবর্তী প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন।


বরেন্দ্র অঞ্চলে নানাবিধ প্রয়োজনে ক্রমবর্ধমান ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিনির্ভরতার ফলস্বরূপ পানিস্তর আশংকাজনকভাবে অধগামী হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পানির নাগালও মিলছে না।  এই পরিস্থিতিতে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর ২৫টি উপজেলার ৪৭টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৫০৩টি মৌজাকে ‘অতি উচ্চ পানি-সংকটাপন্ন’ এলাকা হিসেবে সরকার চিহ্নিত করেছে। এসব এলাকার  ৮৭ লাখের বেশি মানুষ সরাসরি পানি-সংকটের সম্মুখিন হয়েছেন। অতিউচ্চ পানি সংকটাপূর্ণ এলাকাগুলোতে সেচে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ২০২৪-এর ৬ নভেম্বর গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার। 


গেজেট অনুযায়ী, পানি-সংকটাপন্ন এলাকায় খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কোনো কারণে নতুন নলকূপ স্থাপন কিংবা বিদ্যমান নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি তোলা যাবে না। বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করলে বাংলাদেশ পানি আইন, ২০১৩-এর ধারা ২৯ ও সংশ্লিষ্ট অন্য ধারা অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে।


বিকল্প ব্যবস্থা না রেখেই সরকারের এই নিষেধাজ্ঞা সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের সাথে কথা বলে পরিদর্শন টিমের পর্যালোচনায় এমনই তথ্য উঠে এসেছে। দলের পর্যবেক্ষণ হলো- ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে সেচের ওপর নিষেধাজ্ঞার ফলে পানি সংকটাপূর্ণ এলাকায় বোরো ধানের আবাদ বন্ধ করতে হয়েছে। এর ফলে খেতমজুররা কর্মহীনতার শিকার হয়েছেন। কৃষকদের ধানের বদলে পানি-সাশ্রয়ী ফসল সর্ষে, তিল, মসুর ও ভুট্টা চাষের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এতে করে পানি সংকটাপণ্ন এলাকায় শ্রমঘনত্ব কমছে। এর শিকার হচ্ছেন খেত মজুররা। তাদের কাজের পরিধি বেশ ছ্ােট হয়ে আসছে- যা তাদের জীবন-জীবিকাকে প্রভাবিত করছে। এর ফলে অনাকাক্সিক্ষত অভিবাসনের মুখেও পড়তে হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রান্তিক চাষিরাও নিরাপদ নয়। ব্যক্তিগত পানি-বাণিজ্যের প্রবণতা প্রবল হয়েছে; ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা বাধ্যতামূলক বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। প্রান্তিক চাষিরা ভূ-গর্ভস্থ পানির সেচসুবিধাবঞ্চিত হলেও সক্ষম চাষিরা নিজ বন্দোবস্তে ঠিকই সেচ সুবিধা বজায় রাখতে পেরেছে। একই সাথে পানীয়জল ও গৃহস্থালির জন্য ব্যবহৃত পানির চাহিদা বৃস্ধি পেয়েছে। এর সুযোগ নিচ্ছে ব্যক্তি উদ্যোগের জলমটরের মালিকরা। তাদের পানিবিক্রির আওতা বেড়েছে।


রাজশাহীর তানোর উপজেলার বাধাইড় ইউনিয়নের উঁচাডাঙ্গা গ্রামে ওয়ার্পোর একটি টেস্ট বোরিং এর প্রদর্শিত তথ্যে জানা যায়, এই পয়েন্টে ১৬০ ফুটের পর টানা দেড় হাজার ফুটের মধ্যে কোন জলস্তর নাই। গ্রামে বিএমডিএ’র ডিপ টিউবওয়েলটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এলাকাবাসী যারা অবস্থাপন্ন তারা নিজ ব্যয়ে জলমটর বসিয়ে পানীয়জলের প্রয়োজন মেটাচ্ছে। তারা দিব্যি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নিজেদের ফসলে সেচও প্রদান করছে। দরিদ্র বিশেষত আদিবাসীদের জমি ওই মালিকদের কাছে বর্গা দিতে কৌশলে বাধ্য করা হচ্ছে। গ্রামে একটা জলটইটুম্বর পুকুর আছে। কিন্তু মাছ চাষে প্রয়োগকৃত গোবর-বিষ্ঠার কারণে তা ব্যবহারের অযোগ্য। 


তানোর উপজেলার বাধাইড় ইউপির সাবেক সদস্য অনীল সরেন (৬২) ২০০৮ সাল খেকে ডিপ অপারেটরের চাকরি করতেন। সম্প্রতি ডিপ বন্ধ হয়ে গেলে তিনি বেকার হয়ে পড়েন। ভূ-গর্ভস্থ পানিস্তর পানিশূন্য হওয়ায় বিএমডিএ ডিপ তুলে নিয়ে গেছে। অনিলের ভাষ্যমতে, ১২৮ ফিট নিচেও পানি পাওয়া যাচ্ছিল না।


তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এলাকায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু বোরো ধানের চাষ হচ্ছে। তারা ১৬০ ফিট নিচে থেকে পানি তুলে সেচ কাজে ব্যবহার করছেন। অনিল সরেন নিজেও মিনি ডিপ ব্যবহার করে পানি তুলছেন। তার কথা- তিনি সরিষা, গম মসুর আবাদ করছেন। এই আবাদে পানি কম লাগে। যাদের ডিপ সুবিধা নেই তারাও চৈতালি ফসলের আবাদ করছে। 


অনিল সরেন বলেন, সেচ সুবিধার অভাব বা নিষেধাজ্ঞার কারণে বোরো আবাদ বন্ধ হওয়ায় স্থানীয় খেতমজুরেরা বেকার হয়েছেন। তারা অন্যের বোরো জমিতে কাজ করতেন। শ্রমিকরা ধান কেটে পারিশ্রমিক হিসেবে ধান পেতেন। এই ধান তাদের বছরের খাদ্য নিরাপত্তায় সহায়ক হতো। এক মণ ধান কাটলে ৮ কেজি ধান মজুরি পেতেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউনিয়নের ৪-৫ হাজার খেতমজুর কর্ম নিয়ে সমস্যার মধ্যে পড়েছেন। তারা অনেকেই সুযোগ পেলে অন্য জেলা বা উপজেলায় গিয়ে খেত মজুরের কাজ করছেন। অনিলের মতে নিষেধাজ্ঞা জারি হলেও খেতমজুরদের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। এর একটি সুরাহা না হলে ভবিষ্যতে সমস্যা আরো বাড়বে। 


এলাকার নরেন চঁড়ের ছেলে সুমায়েন চঁড়ে (৩৮) এখন বেকার হয়ে পড়েছেন। মজুরি বাবদ পাওয়া ধান দিয়ে আরো মাস দুয়েক চলে যাবে। কিন্তু শুধু তো চাল সেদ্ধ করেই চলে না তার সাথে শাক-সবজি বা তরকারির প্রয়োজন হয়। কিন্তু তা কেনার সামর্থ তার নেই। তার মতে এমন একটা ব্যবস্থা বাঞ্ছনীয়- যাতে করে এলাকার মজুর শ্রেণির কর্মসংস্থানের একটি বিহিত হয়। তবে তিনি বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির যেমন সুরক্ষা দিতে হবে-তেমনই তাদের ফসল ্উৎপাাদনের জন্য সেচ সুবিধার বিকল্প সরকারকেই করতে হবে। 


এলাকার অন্যরাও বলছিলেন, বোরো ধানের আবাদ বন্ধ করা সমস্যার সমাধান নয়। বোরো ধানের সাথে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তাদের মতে সেচের জন্য পদ্মা বা মহানন্দা নদীর পানি এ ক্ষেত্রে ভাল সমাধান হতে পারে। 


সুমায়েন চঁড়ে জানান, খাওয়া ও গৃহস্থালি কাজে তারা সরবরাহ পানি পেয়ে থাকেন- তার জন্য প্রতিজনে মাসে ২০ টাকা করে দিতে হয়। 


গোলেনুর বেগম বলছিলেন, খাওয়া ও গৃহস্থলির কাজের জন্য যে পরিমাণ পানি তারা ব্যবহার করেন তাতে তাদের প্রয়োজন মেটে না- এর জন্য আরো মোটর ( সেমি ডিপ) বসাতে হবে। 


চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার সাংবাদিক আব্দুস সাত্তার পর্যবেক্ষক দলকে বলেন, বরেন্দ্র এলাকার খরা মোকাবিলায় বেশ কিছু উদ্যোগের কথা শোনা যায় কিন্তু তার বাস্তবায়ন লক্ষ্য করা যায় না। যেমন- ভবন কোড অনুযায়ী বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের কথা বলা হয়, কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে এর প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায় না। কৃত্রিম উপায়ে বৃষ্টির পানি ভূ-গর্ভ স্তরে নিয়ে রিচার্জ করার উদ্যোগও তেমন এগোয়নি। তিনি বোরো মৌসুমে পদ্মার পানির ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, এক সময় উপজেলার নেজামপুরে ভূ-স্তরের ৪৫ ফিটের মধ্যেই পানি পাওয়া যেত, এখন ১৫০ ফিটেও পানি পাওয়া যায় না। এই পরিস্থিতি ভয়াবহ দুর্যোগের ইঙ্গিত দেয়। 


নাচোল উপজেলার কশবা ইউনিয়নের ছুটিপুর আদিবাসীপাড়াতে পানি নিয়ে একই ধরনের সমস্যা পরিলক্ষিত হয়। তবে, বিএমডিএ পানীয়জল সরবরাহ করে, জনপ্রতি কুড়ি টাকা (হেরফের হয়) পানিচার্জ নিয়ে থাকেন। এইগ্রামেও জলভরা পুকুর রয়েছে। তবে মাছ চাষের জন্য লিজ দেয়া হয়, এ পানি সাধারণের ব্যবহার অনুপযোগী।


নওগাঁ জেলার সাপাহার সদর থেকে ৬ কি.মি পশ্চিমে বাখরপুর তালতলা গ্রামের স্বপন হেমব্রমের স্ত্রী পোস্তান সরেন বলছিলেন, তাদেরকে প্রতিমাসে জনপ্রতি ২০ টাকা করে পানির জন্য দিতে হয়। সদ্যজাত শিশুর জন্যও এই চার্জ প্রয়োজ্য। এখানে গরুপ্রতিও ২০ টাকা দিতে হয়। 


পোস্তান সরেনের বর্ণনায় এটা স্পষ্ট যে, খাবার ও নিত্য প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ- ব্যবসা বিবেচনায় দেখা হয়। 


পর্যবেক্ষণ দলের মতে, অচিরেই বিকল্প ব্যবস্থা না হলে- পারিবারিক কৃষি ঝুঁকির মুখে পড়বে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্যে অভিগম্যতা কমবে; পানি আইন, বর্গা আইন কিংবা মহামান্য হাইকোর্টের রায় লঙ্ঘিত হতে পারে। সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধানের উপায়গুলোও ছিল বেশ সুচিন্তিত ও গঠনমূলক। এলাকার মানুষ পানির সংকটকে নিজেদের সমস্যা বোধ করছেন, একইভাবে তারা তাদের জীবন-জীবিকা অনিশ্চয়তায় উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। 


তাদের পরামর্শ হলো-বোরো আবাদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনমাস খেত মজুরদের জন্য সরকারি প্রণোদনা প্রয়োজন। এবং ভূ-উপরিস্থ জলাধার- পুকুর, খাড়ি, বিল-নদী উদ্ধার ও খনন করা এবং সামাজিক মালিকানায় নেয়া; সেচ কাজে পদ্মা ও মহানন্দার পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, বিএমডিএর কর্মপরিধি পর্যালোচনা পূর্বক তা পুনঃনির্ধারণ করা আবশ্যক এবং সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের কৃষি ও সেচ বিষয়ক কর্মকাণ্ডে জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করে জনবান্ধব কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা।


বরেন্দ্র অঞ্চলের পানির স্তর সংকট কেবল একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়।এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক-সর্বোপরি মানবিক সমস্যা। সেই নিরিখেই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সমাধান দিতে হবে।