জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে ‘আঁধারের আলো’ বয়স্ক শিক্ষা নিকেতন

আপডেট: জুন ৯, ২০১৭, ১১:৪১ অপরাহ্ণ

সফিকুল ইসলাম, শিবগঞ্জ


‘আঁধারের আলো’ বয়স্ক শিক্ষা নিকেতনে অক্ষর শেখাচ্ছেন উদ্যোক্তা আবদুর রব-সোনার দেশ

‘বিনা টাকায় রব স্যারের দেয়া বই, শ্লেট ও চকপেন্সিল পেয়ে পড়তে পেয়ে মাত্র চার মাসের ল্যাইগা ল্যাখাপড়া করতে এ্যাসছি। গেল দুইমাসে ম্যালাই শিখেছি। হামি হামার নাম, বাড়ির মালিকের (স্বামী) নাম লেখতে পারি। হেসাব করতে পারি। ছোট ছোট বই গ্যালা পড়তে পারি। হামরা ২৬ জন (নারী) এক দলে আছি। স্যারের কাছে চার মাস পইড়া হামরা সবাই পেরাইমারি (প্রাইমারি) স্কুলে যাবো। যেদিন বাঁচবো ততদিনই পড়বো। মানুষে যা পারবে তাই কহুক গা(সমালোচনামূলক কথা)।
কথাগুলো বলছিলেন ‘আঁধারে আলো’ বয়স্ক শিক্ষা নিকেতনে পড়তে আসা ৭৫ বছরের বৃদ্ধ গাজলী বেগম। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার মোবারকপুর ইউনিয়নের সাহেবনগর গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মনিরুলের অনার্স পড়–য়া শিক্ষার্থী আবদুর রবের নিজ উদ্যোগে ও খরচে গড়ে তোলা এ ‘আঁধারে আলো’ বয়স্ক শিক্ষা নিকেতন। গাজলী বেগম একই গ্রামের হযরত আলির স্ত্রী।
শুধু গাজলী বেগমই নয় একই গ্রামের মৃত সলেমানের স্ত্রী রাশেদা বেগম (৭৫), মৃত সহিমুদ্দিনের স্ত্রী শহববানু (৭৫) ও গাজলীর পুত্রবধূ মনোয়ারা বেগমসহ উপস্থিত ২৬ জন নারী।
সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, আবদুর রবের নিজ বাড়ির উঠানে অভিনব কায়দায় গ্রামের ৪০ হতে ৭৫ বছর বয়স্ব ২৬ জন নারীকে অক্ষরজ্ঞান দিচ্ছেন রব। নিজ উদ্যোগে ও নিজ খরচে বর্তমানে আঁধারে আলো বয়স্ক শিক্ষা নিকেতন নামে একটি বয়স্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে তিনটি ইউনিয়নে কয়েকটি দল গঠন করে ১৪০ জন পুরুষ ও ১৩৬ জন নারী মিলে মোট ২৭৬ নারী-পুরুষদের অক্ষর শেখান তিনি। বর্তমানে আরো কয়েকটি দল নিয়ে অক্ষর শেখানোর কাজ চলছে।
উদ্যোক্তা আবদুর রব জানান, ২০০৯ সালে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় তোহরুল ইসলাম নামে একজন আমার কাছে নাম লিখা শিখতে আসলে তাকে নাম লেখা শিখিয়ে দিই এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যে নিজেকে চলারমতো শিক্ষাদান করতে পেরে সিদ্ধান্ত নিই আমি গ্রামের সবাইকে অক্ষরজ্ঞান শেখাবো। ২০১৩ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে আমার পৃর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী নিজের সাইকেল ও মোবাইল বিক্রি করে পূর্বে প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত হয়ে প্রাথমিকজ্ঞান সংবলিত নিজের লেখা একটি বইয়ের ফটোকপি করি। গ্রামের তারভির, জাফরসহ কয়েকজন বন্ধুর উৎসাহে বয়স্ক পুরুষ ও নারীদের নিয়ে চারমাসের কোর্সের দুইটি ব্যাচ তৈরি করে অক্ষর শেখানো শুরু করলে চার মাসেই সফলতা পেয়ে যায়। এ সাফল্য আমাকে আরো অনুপ্রাণিত করে তোলে এবং আমার উৎসাহ আরো বেড়ে যায়।
তিনি আরো জানান, পরবর্তীতে আমার পরিকল্পনানুযায়ী গ্রামের আরো কয়েকজনের সঙ্গে আলোচনা করে ‘আঁধারে আলো’ বয়স্ব শিক্ষা নিকেতন নামকরণ করে বাবার দেয়া লেখাপড়া বাবদ দেয়া টাকা থেকে সঞ্চয়কৃত ও নিজে পালন করা গরু বিক্রি করা লাভের টাকার কিছু অংশ দিয়ে আমি পুরোদমে কাজ শুরু করি। অক্ষরজ্ঞান শেখানোর প্রসার ঘটাতে কানসাট, চককীর্র্তি ও মোবারকপুর ইউনিয়নে ৮ ওয়ার্ডে জরিপ করে মোট প্রায় ১২ হাজার বয়স্কদের মধ্যে পাঁচ হাজার ৪২৬ জন নিরক্ষর ব্যক্তি পাই। বর্তমানে আমি তিনটি ইউনিয়নে ৮টি ওয়ার্ডেই ‘আঁধারে আলো’ বয়স্ব শিক্ষা নিকেতনের মাধ্যমে অক্ষরজ্ঞান শেখানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।
‘জেগেছে যুবক, জেগেছে দেশ, গড়বো মোরা নিরক্ষরমুক্ত বাংলাদেশ’ স্লোগানকে সামনে রেখে আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি এবং এভাবে আমি আমার ইউনিয়ন, থানা, জেলা এমনকি সারাদেশেই এ পদ্ধতি চালু করে দেশের অসহায় নিরক্ষরদেরকে আমি অক্ষরজ্ঞান শেখানোর ব্যবস্থা করবো। আর এজন্য দরকার উৎসাহী যুবকদের। কোন বিত্তবানদের নয়। এ কাজের মধ্য দিয়ে পরকালের মুক্তি ও দেশকে নিরক্ষরমুক্ত দুটো কাজ একসঙ্গেই হবে।
নিজের সপ্নের কথা বলতে গিয়ে আবদুর রব জানান, লেখপড়া শেষে চাকরি না করে একটি গরুর খামার তৈরি করে আমার বেকারত্ব ঘুচিয়ে স্বাবলম্বী হবো। সংসার চালার পাশাপাশি নিজ খরচে আঁদারে আলো বয়স্ক শিক্ষা নিকেতনের মাধ্যমে নিরক্ষর দূরীকরণে আমার অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
আবদুর রবের এ কাজে এখন পর্যন্ত কেউ কোন ধরনের আর্থিক সহযোগিতা করেন নি। তবে প্রথমদিকেই কানসাট সলেয়মান ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ শফিকুল ইসলাম বিশ্বাস ২০টি শ্লেট কিনে দিয়েছিলেন এবং তাকে উৎসাহ প্রদান করেছেন। বিভিন্ন সংস্থা থেকে প্রস্তাব আসে তাদের হয়ে কাজ করার জন্য। কিন্তু নানাবিধ করণে আবদুর রব রাজি হয় নি বলে তিনি জানান।
আবদুর রবের এ কাজকে শতভাগ মহতী উদ্যোগ উল্লেখ করে উপজেলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যন সায়েমা বেগম বলেন, আমাদের সবার উচিত আবদুর রবের আঁধারে আলো বয়স্ক শিক্ষা নিকেতনকে ত্বরান্তিত করতে এগিয়ে আসা। আমার পক্ষ থেকে যতটুকু পারি সহযোগিতা করবো। তিনি আরো আশাবাদী যে তার মাধ্যমে শিবগঞ্জের সমস্ত নিরক্ষর জ্ঞানের আলো পাবে।
জানতে চাইলে মোবারকপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তোহিদুর রহমান বলেন, অবশ্যই এটি ভালো কাজ, শুধু আমার ইউনিয়ন নয়, তার মাধ্যমে সারা উপজেলায় আঁধারে আলো বয়স্ক শিক্ষা নিকেতন চালু করতে তার সাথেই আছি এবং থাকবো।
এ বিষয়ে কানসাট সলেয়মান ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ শফিকুল ইসলাম বিশ্বাস জানান, আঁধারে আলো বয়স্ক শিক্ষা নিকেতনের মাধ্যমে আবদুর রবের অক্ষরজ্ঞান ছাড়ানোর কাজটি মাইলফলক হয়ে থাকবে এবং সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে। একই কথা বলেন গ্রামের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অর্ধশতাধিক মানুষ।