ফুলবাড়ী ট্র্যাজেডির ২০ বছর : অন্ধকারেই ছয় দফা, নতুন উন্মুক্ত খনির ইঙ্গিতে ফের উত্তাল জনপদ
আজ ২৬ আগস্ট। দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লাখনি বিরোধী আন্দোলনের ট্র্যাজেডি দিবসের ২০ বছর পূর্তি। ২০০৬ সালের এই দিনে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিরোধিতায় আন্দোলনরত মানুষের ওপর তৎকালীন বিডিআরের গুলিতে তিন যুবক নিহত এবং দুই শতাধিক নারী-পুরুষ আহত হন।
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ডাকে বহুজাতিক কোম্পানি এশিয়া এনার্জির ফুলবাড়ী কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে সেদিন ফুলবাড়ীসহ আশপাশের এলাকার হাজারো মানুষ অংশ নেন। দুপুরের দিকে বিক্ষোভকারীরা কার্যালয়ের দিকে অগ্রসর হলে ছোট যমুনা নদীর পূর্ব ও পশ্চিম পাশে দায়িত্বে থাকা তৎকালীন বিডিআর সদস্যদের গুলিতে রাজশাহী কলেজের ছাত্র তরিকুল ইসলাম এবং কর্মজীবী যুবক আমিন ও সালেকিন নিহত হন। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ ও লাঠিচার্জে আহত হন অন্তত দুই শতাধিক নারী-পুরুষ।
ঘটনার পর তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ডাকে অনির্দিষ্টকালের হরতাল ও অবরোধ শুরু হয়। ২৬ থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল ফুলবাড়ী। আন্দোলনের মুখে ৩০ আগস্ট পার্বতীপুর উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোট সরকারের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ছয় দফা সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
চুক্তিতে সরকারের পক্ষে স্বাক্ষর করেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র মিজানুর রহমান মিনু এবং আন্দোলনকারীদের পক্ষে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সমঝোতা চুক্তির কিছু অংশ বাস্তবায়িত হলেও দুই দশক পেরিয়ে গেলেও এশিয়া এনার্জিকে দেশ থেকে বহিষ্কার এবং দেশের কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লাখনি বাস্তবায়ন না করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দফা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এসব দাবি বাস্তবায়নে আন্দোলনও অব্যাহত রয়েছে।
দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন পৃথক কর্মসূচি নিয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে কালো পতাকা উত্তোলন, কালো ব্যাজ ধারণ, আমিন-সালেকিন-তরিকুল স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধাঞ্জলি, স্মরণসভা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা।
ফুলবাড়ী ট্র্যাজেডির দুই দশক পূর্তির এমন সময়ে নতুন করে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের প্রসঙ্গ সামনে আসায় এলাকায় আবারও আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত ১৬ আগস্ট রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানে সরকার নতুন নীতিগত পদক্ষেপ নিচ্ছে। তিনি বলেন, “এখন আমরা ফুলবাড়ী এবং অন্যান্য স্থানে ওপেন-পিট কয়লা উত্তোলনের দিকে যাচ্ছি।” এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ী শাখা। সংগঠনটির নেতারা ফুলবাড়ী ও বড়পুকুরিয়ায় উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের যেকোনো উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
সংগঠনটির ভাষ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের সমাধানের নামে পরিবেশ ও জনস্বার্থবিরোধী কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে তারা তা প্রতিহত করবেন।
ফুলবাড়ীর মানুষের কাছে বিষয়টি শুধু কয়লা উত্তোলনের নয়; এর সঙ্গে মানুষের বসতভিটা, কৃষিজমি, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। ২০০৬ সালের গণআন্দোলনে নিহত আমিন, সালেকিন ও তরিকুলের রক্তের বিনিময়ে হওয়া ছয় দফা চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ দফাগুলো বাস্তবায়ন না করেই নতুন করে উন্মুক্ত কয়লাখনির আলোচনা গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তারা।
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ী শাখার আহ্বায়ক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম জুয়েল বলেন, “২০০৬ সালের মতো দেশ ও জনস্বার্থবিরোধী যেকোনো উদ্যোগের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ আবারও রাজপথে নেমে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।”
দুই দশক পেরিয়েও তাই ফুলবাড়ীর মাটির নিচে থাকা কয়লার চেয়ে বড় হয়ে আছে মানুষের জীবিকা, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্ন। আর নতুন করে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের আলোচনা সেই পুরোনো আন্দোলনের জনপদকে আবারও সরব করে তুলেছে।