হামের প্রকোপ বাড়ছেই, আক্রান্ত-মৃত্যুতে উদ্বেগ
দেশে হামের প্রকোপ থামছে না। বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির পরও আগস্টে জুলাইয়ের তুলনায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি এবং মৃত্যুর সংখ্যা দুটিই বেড়েছে। এতে একদিকে যেমন হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে টিকাদান কর্মসূচির পরও কেন সংক্রমণ কমছে না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে ৩০ হাজার ২০৯ শিশু হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। এ সময়ে মৃত্যু হয় ১১৮ জনের। আগস্টে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩২ হাজার ৬০২ জন শিশু, মৃত্যু হয়েছে ১৩৩ জনের। এক মাসের ব্যবধানে হাসপাতালে ভর্তি রোগী বেড়েছে ২ হাজার ৩৯৩ জন। একই সময়ে মৃত্যু বেড়েছে ১৫ জন।
তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে হাসপাতালে ভর্তি রোগী বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশ। আর মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ। দুই মাসে মোট ৬২ হাজার ৮১১ শিশু হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে ২৫১ জনের।
শুধু জুলাই-আগস্টের হিসাব নয়, বছরের সামগ্রিক চিত্রও উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত দেশে সন্দেহভাজন হামে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৪৫ জন। এ সময়ে সন্দেহভাজন হামে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৭৪ জনে। ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৯৯ জনের।
টিকাদানের পরও কেন কমছে না হাম
হামের সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার এপ্রিল থেকে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের বিশেষ এই কর্মসূচির আওতায় আনা হয়। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির বাইরে গিয়ে শিশুদের টিকা দেওয়ার এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল দ্রুত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের হামের প্রাদুর্ভাব দেশের ৬৪ জেলাতেই ছড়িয়ে পড়েছিল। আক্রান্তদের বড় অংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। প্রাদুর্ভাবের শুরুতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশ্লেষণে দেখা যায়, আক্রান্তদের প্রায় ৭৯ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের কম। দুই বছরের কম বয়সীদের অংশও ছিল উল্লেখযোগ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অন্যতম কারণ দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত টিকাদানে তৈরি হওয়া ঘাটতি। করোনাভাইরাস মহামারির সময় টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাত, পরবর্তী সময়ে শিশুদের টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম এবং কিছু এলাকায় টিকার কভারেজ কমে যাওয়ায় বড়সংখ্যক শিশু পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ছাড়াই বেড়ে উঠেছে।
ফলে একটি জরুরি টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক শিশুকে টিকার আওতায় আনা গেলেও আগের ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করতে সময় লাগছে। একই সঙ্গে টিকা দেওয়ার পর শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতেও কিছুটা সময় প্রয়োজন।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পাঁচ বছরের কম বয়সীরা
হামের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা। বিশেষ করে দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের ঝুঁকি বেশি। আবার ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে যাদের অনেকেরই নিয়মিত হামের টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি।
বাংলাদেশের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে হামের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয় ৯ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাসে। কিন্তু চলতি বছরের জরুরি পরিস্থিতিতে বয়সসীমার বাইরে গিয়েও ছোট শিশুদের টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. লুৎফর নাহার বেগম বলেন, “হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়। ফলে হাম থেকে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্ট শিশুদের ক্ষেত্রে এসব জটিলতা গুরুতর হওয়ার আশঙ্কা বেশি।”
তিনি বলেন, “শুধু একটি বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে হামের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে কোনো শিশু বাদ পড়ছে কি না, সেটি নজরদারির মধ্যে আনতে হবে। পাশাপাশি যেসব এলাকায় টিকার কভারেজ কম, সেখানে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।”
হাম শুধু জ্বর ও র্যাশের রোগ নয়
অনেকের কাছে হাম সাধারণ জ্বর ও শরীরে লালচে দাগের রোগ হিসেবে পরিচিত হলেও এর জটিলতা গুরুতর হতে পারে। আক্রান্ত শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যাওয়ায় নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ, চোখের সমস্যা এমনকি মস্তিষ্কের প্রদাহও হতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্ট শিশুদের ক্ষেত্রে হামে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে। একই কারণে প্রাদুর্ভাবের সময় শিশুদের পুষ্টি পরিস্থিতির দিকেও নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
আর ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরা আক্রান্ত হওয়ায় পরিস্থিতির আরেকটি দিক সামনে এসেছে। এসব শিশুর অনেকের নিয়মিত হামের টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি। ফলে তাদের সুরক্ষায় মায়ের কাছ থেকে পাওয়া রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, বুকের দুধ, পুষ্টি এবং পরিবারের সদস্যদের টিকাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আবারো দেশব্যাপী টিকাদান
সংক্রমণ অব্যাহত থাকায় সরকার নতুন করে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, তিন সপ্তাহের মধ্যে আবারো দেশব্যাপী হামের টিকাদান কর্মসূচি চালানো হবে।
সরকারের লক্ষ্য, আগের কর্মসূচিতে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনা এবং যেসব এলাকায় টিকাদানের ঘাটতি রয়েছে সেখানে কভারেজ বাড়ানো।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোজাম্মেল হকে বলেন, “হামের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা তৈরি করতে হলে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির ওপরই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো এলাকায় টিকাকভারেজ ৯৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে সেখানে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই শুধু প্রাদুর্ভাবের সময় টিকা দেওয়া নয়, নিয়মিত কর্মসূচিতে শিশুদের দুটি ডোজ টিকা নিশ্চিত করাই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।”
তথ্যসূত্র: রাইজিংবিডি