রাজশাহীর ড্রেনে তরল চিকিৎসা বর্জ্য
রাজশাহীর হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর অধিকাংশেই তরল চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের অপরিশোধিত তরল বর্জ্য সরাসরি নগরীর ড্রেনে গিয়ে পড়ছে। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ড্রেনের পানি বারনই নদীতে গিয়ে পড়ে। ফলে নগরীর ড্রেনের বর্জ্যও শেষ পর্যন্ত নদীতে গিয়ে মিশছে। শুধু তাই নয়, অতিবৃষ্টি হলে ড্রেন উপচেপড়ে পানি ফসলি জমিতেও ছড়িয়ে পড়ে। পদ্মা নদীও এ দূষণ থেকে মুক্ত নয়। নগরীর ড্রেনের পানি পদ্মা নদীতে গিয়ে পড়ে। এর ফলে দূষিত হচ্ছে পানি ও পরিবেশ। একই সঙ্গে এসব বর্জ্যে থাকা জীবাণু ও ক্ষতিকর উপাদান মানুষের সংস্পর্শে এসে বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ ও রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
তরল বর্জ্যের মধ্যে রয়েছে রক্ত, শরীরের বিভিন্ন তরল পদার্থ, রাসায়নিক পদার্থ এবং বিভিন্ন ধরনের জীবাণুযুক্ত উপাদান। নিয়মানুযায়ী, এসব তরল বর্জ্য শোধন করে নিরাপদভাবে নিষ্কাশন করার কথা। কিন্তু পর্যাপ্ত শোধনব্যবস্থা না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান অপরিশোধিত তরল বর্জ্য পয়োনিষ্কাশন বা ড্রেনেজ লাইনের মাধ্যমে বাইরে ফেলছে।
এসব তরল বর্জ্যে নানা ধরনের রোগজীবাণু, ক্ষতিকর রাসায়নিক এবং ওষুধের অবশিষ্টাংশ থাকে। এগুলো কোনো ধরনের শোধন ছাড়া ড্রেনে ফেললে পরিবেশ ও জলজ জীবনের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। বিষাক্ত তরল নদী-নালা, খাল বা ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশে যায়। বর্জ্যে থাকা ভারী ধাতু (যেমন- পারদ, সিসা) এবং রাসায়নিকের কারণে মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী মারা যায় এবং পানির অক্সিজেন কমে যায়। তরল বর্জ্যে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের অংশ থাকে। যা ড্রেন বা আশেপাশের পরিবেশের ব্যাকটেরিয়াগুলো ওই অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। পরবর্তীতে এই ‘সুপারবাগ’ ব্যাকটেরিয়া দ্বারা মানুষ আক্রান্ত হলে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ আর কাজ করে না, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের জন্য এখন বড় একটি উদ্বেগের কারণ। সংক্রামক রোগের বিস্তার এই বর্জ্যে রক্ত, পুঁজ, এবং বিভিন্ন সংক্রামক রোগজীবাণু থাকে। যা ড্রেনের পানি উপচে পড়লে বা মশার মাধ্যমে হেপাটাইটিস বি, সি, টাইফয়েড, কলেরা এবং ডায়রিয়ার মতো মারাত্মক রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের পক্ষ থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে ঢাকা জেলার নদ-নদী, খাল-বিল দূষণকারীদের তালিকা চাওয়া হয় ২০২১ সালের নভেম্বরে। এক মাস
পর পরিবেশ অধিদপ্তর ঢাকার খাল ও নদ-নদী দূষণকারীদের তালিকা নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। এতে প্রাথমিকভাবে দূষণের ২৮০টি উৎস চিহ্নিত করা হয়। সেখানে দেখা যায়, শিল্প বর্জ্যের পাশাপাশি রাজধানীর হাসপাতালের তরল বর্জ্যও দূষণের একটি বড় উৎস। প্রতিবেদনে উল্লিখিত ২৮০টি উৎসের মধ্যে ২২০টিই ছিল হাসপাতাল।
রাজশাহী সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যা বলছে, জেলায় হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ২১৬টি। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র দুটিতে তরল বর্জ্য শোধনের জন্য কার্যকর ইটিপি বা বর্জ্য শোধনাগার রয়েছে। অর্থাৎ ২১৪ চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেরই তরল মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। যা বেআইনি- তা হলে এগুলো চলতে পারছে কি ভাবে। সমস্যা কোথায়? উদ্যোক্তাদের সাথে বসে সমস্যাগুলোও চিহ্নিত করা দরকার। খাদ্য শৃঙ্খলেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ছে কী না সেপিও বিবেচনায় নিরতে হবে। কীভাবে সমস্যার সমাধান সম্ভব- সে পদক্ষেপ নেয়ার সময় এখনই। সমস্যা উপেক্ষা করে অজুহাত প্রাধান্য পেলে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যেই থেকে যাবে।