আবাসিক মিটারে চলছে অটোরিকশার চার্জিং ব্যবসা
রাজশাহীর মহানগরীর ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ব্যাটারি চার্জের চাহিদাও। নগরীর বিভিন্ন গ্যারেজ, অলিগলিতে ছোট-বড় চার্জিং পয়েন্ট। কোথাও বাণিজ্যিক মিটারে বৈধভাবে চলছে এই কার্যক্রম, আবার কোথাও বাণিজ্যিক মিটারের আড়ালে আবাসিক সংযোগ ব্যবহার করে অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও আবার বিদ্যুতের মূল লাইন থেকে হুকিং বা বাইপাস করেও চার্জ দেওয়ার তথ্য মিলেছে।
কম খরচে বিদ্যুৎ ব্যবহারের এই প্রবণতায় একদিকে সরকার হারাচ্ছে বিপুল রাজস্ব, অন্যদিকে বাড়ছে বিদ্যুৎ চুরি, অতিরিক্ত লোড, অগ্নিকাণ্ড ও বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি। ফলে অটোরিকশা চার্জিং ব্যবস্থা এখন শুধু পরিবহন খাতের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব ও জননিরাপত্তার বড় প্রশ্ন। আধুনিক বিশ্বে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের জন্য পরিকল্পিত ও বৈধ চার্জিং স্টেশন গড়ে উঠলেও বাংলাদেশে এখনো সেই অবকাঠামো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। ফলে অটোরিকশার বাড়তি চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য অনানুষ্ঠানিক চার্জিং পয়েন্ট ও গ্যারেজ।
রাজশাহী মহানগরীতে কোথাও বাড়ির মিটারে, কোথাও দোকানের সংযোগে এবং কোথাও বৈধ সংযোগের বাইরে সরাসরি মেইন লাইন থেকে রাতভর চার্জ দেওয়া হচ্ছে ব্যাটারি। প্রতি অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ বাবদ দৈনিক ১৮০ থেকে ২০০ টাকা নেওয়া হলেও সেই বিদ্যুৎ ব্যবহারের বড় অংশই যাচ্ছে আবাসিক কিংবা অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে অনুমোদিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রয়েছে ৮ হাজার ৯৭০টি। ছোট অটোরিকশা রয়েছে ৫ হাজার ৮১৯টি। সব মিলিয়ে নিবন্ধিত অটোরিকশার সংখ্যা ১৪ হাজার ৭৮৯টি। তবে প্রতিদিন চলাচল করে প্রায় ৫০ হাজারের বেশি অটোরিকশা। অটোরিকশার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নগরীতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্ট। প্রায় সাড়ে ৫০০ অটোরিকশা গ্যারেজ রয়েছে। অনেক গ্যারেজে অগ্নিনিরাপত্তা ও নিরাপদ বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাও নেই।
বিদ্যুৎ প্রকৌশলীদের মতে, একটি সাধারণ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বা ইজিবাইকে চার থেকে ছয়টি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি থাকে। একবার পূর্ণ চার্জ দিতে ৬ থেকে ১০ ইউনিট বিদ্যুৎ লাগতে পারে। সময় লাগে ৫ থেকে ৮ ঘণ্টা। রুয়েট ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. রবিউল ইসলাম সরকার বলেন, কয়েকশো অটোরিকশা চার্জে দেওয়ায় গ্রিডে বড় চাপ পড়ে। একটা ব্যাটারিরিকশা চার্জ দিতে ১০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ খরচ হয়।
রাসিকের রাজস্ব কর্মকর্তা আবু সালেহ মো. নূর-ঈ-সাইদ বলেন, নগরীতে মোট কতটি অটোরিকশা গ্যারেজ রয়েছে, সঠিক সংখ্যা জানা নেই। মাঝে মাঝে গ্যারেজে গিয়ে স্টিকার দেওয়া হয়। অবৈধভাবে অটোরিকশায় চার্জ দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আগে এমন ঘটনা ঘটলেও এখন নেই বললেই চলে। কোথাও অনিয়ম পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের প্রধান প্রকৌশলী (অপারেশন) জিয়াউল ইসলাম বলেন, অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে অটোরিকশা বা চার্জার রিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার বিষয়টি তাদের নজরে রয়েছে। অবৈধ সংযোগ ও বিদ্যুতের অপব্যবহার বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। আবাসিক সংযোগ ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার ঠেকাতে সরকার ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন, কিউআর কোড ও জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে। লাইসেন্সবিহীন ও নিয়মভঙ্গকারী অটোরিকশার বিরুদ্ধে রাসিক ও রাজশাহী মহানগর পুলিশ (আরএমপি) অভিযান চালাচ্ছে। নগরীর জিরোপয়েন্ট, রেলগেট, তালাইমারী ও ভদ্রাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চলছে নজরদারি।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু অটোরিকশার নিবন্ধন ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। চার্জিং ব্যবস্থাকেও নিয়মের আওতায় আনতে হবে। কারণ সড়কে চলাচলকারী অটোরিকশার বৈধতা যাচাই করা গেলেও কোন সংযোগের বিদ্যুৎ দিয়ে তার ব্যাটারি চার্জ হচ্ছে, সেই হিসাব এখনো স্পষ্ট নয়। আবাসিক সংযোগ ব্যবহার করে বাণিজ্যিক চার্জিং চলতে থাকলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বাড়তে থাকবে অতিরিক্ত চাপ, সিস্টেম লস ও রাজস্ব ক্ষতির ঝুঁকি।