শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬

পদ্মার পানিতে ডুবল চরের সবজি, ক্ষতির মুখে কৃষক

নিজস্ব প্রতিবেদক ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:০১ অপরাহ্ন কৃষি
নিজস্ব প্রতিবেদক ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:০১ অপরাহ্ন
পদ্মার পানিতে ডুবল চরের সবজি, ক্ষতির মুখে কৃষক

কয়েক দিন আগেও সবুজে ভরা ছিল পদ্মার চর। পটল, শসা, করলা, লাউ, ফুলকপি ও টমেটোর খেতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছিলেন কৃষকেরা। এখন সেই খেতের কোথাও কোমরসম পানি, কোথাও পচে যাওয়া গাছ। ফসল বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে কেউ পানি সরাচ্ছেন, কেউবা পচে যাওয়া গাছ তুলে ফেলছেন। ফসল ঘরে তোলার আগেই এমন ক্ষতিতে বিনিয়োগের টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন পবা উপজেলার চরাঞ্চলের কৃষকেরা। 


পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের আলিমগঞ্জ ও কসবা এলাকার চরাঞ্চলে সরেজমিনে দেখা যায়, বেশ কিছু সবজিখেত পানিতে তলিয়ে আছে। আগাম জাতের ফুলকপি, বাঁধাকপি ও টমেটোর গাছ পচে গেছে। পটল, করলা, লাউ ও শসার গাছও পানিতে ডুবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোনো কোনো জমিতে কৃষকেরা নষ্ট গাছ তুলে জমি পরিষ্কার করছেন।


কসবা এলাকার কৃষক আকবর আলী একটি জমি থেকে পচে যাওয়া পটলগাছ তুলছিলেন। তিনি বলেন, তার এক বিঘা পটল, ১০ কাঠা শসা ও পাঁচ কাঠা ঝিঙের আবাদ পানিতে ডুবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পটলগাছ পচে যাওয়ায় সেগুলো তুলে ফেলতে হচ্ছে। 


তিনি বলেন, এখন যেটুকুন পটলের গাছ ভালো আছে, সেটুকুনও তো মরে যাছে। তাহলে তো সবই শেষ। আমরা কী করে বাঁচব?’ 


কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কসবা এলাকার পদ্মার চরের বিভিন্ন জমিতে প্রায় সাত দিন পানি জমে ছিল। এতে বেশির ভাগ ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষক মো. নজরুল ইসলামের প্রায় ১০ কাঠা করলা, ১০ কাঠা শসা, ১০ কাঠা লাউ, দেড় বিঘা বিভিন্ন জাতের কপি, ১৫ কাঠা পটল ও পাঁচ কাঠা টমেটোর আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 


নজরুল ইসলামের হিসাবে, টমেটোতে প্রায় ১০ হাজার, পটলে ৩০ হাজার, করলায় ১০ হাজার, শসায় ২০ হাজার, লাউয়ে ১৫ হাজার এবং কপিতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। এতে তাঁর বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, কৃষি বিভাগের লোকজন জমি দেখে গেলেও এখনো কোনো সহায়তা পাননি। 


আরেক কৃষক শাহরিয়ার রহমান রাসেলের প্রায় ১০ হাজার ফুলকপি ও বাঁধাকপির চারা নষ্ট হয়েছে। ফসল ভালো থাকলে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা বিক্রির আশা করেছিলেন তিনি। এখন সেই আশা অনিশ্চিত। রাসেল বলেন, আমরা কৃষক, কোনো ফসল নষ্ট হোক এটা চাই না। আপ্রাণ চেষ্টা করেছি ফসল বাঁচানোর জন্য। তারপরও সম্ভব হয়নি। 


পটলচাষি মো. শামিম আল মামুনের ১৫ কাঠা পটলের আবাদও পানিতে ডুবে নষ্ট হয়েছে। এতে অন্তত দুই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানান তিনি। এখন পটল তোলার ভরা মৌসুম হওয়ায় ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়েছে বলে তাঁর দাবি। 


কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, হঠাৎ বন্যায় রাজশাহীর পবা, বাঘা ও গোদাগাড়ী উপজেলায় মোট ৩০৯ দশমিক ৫৯ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৪৫ দশমিক ২৪ হেক্টর সবজি, ৮৫ দশমিক ৩৯ হেক্টর মাসকলাই, ১১ দশমিক ৪৬ হেক্টর রোপা আমন, ২৫ হেক্টর রোপা আউশ, ১০২ হেক্টর হলুদ, ২৫ হেক্টর পেঁপে, ১০ হেক্টর পেয়ারা এবং ৫ দশমিক ৫০ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজতলা রয়েছে। এর মধ্যে পবায় সবজি ৭ দশমিক ২৪, মাসকলাই ৬ দশমিক ৩৯ ও রোপা আমন শূন্য দশমিক ৪৬ হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়েছে। গোদাগাড়ীতে সবজি ১০, মাসকলাই ১৭ ও রোপা আউশ ২৫ হেক্টর এবং বাঘায় সবজি ২৮, মাসকলাই ৬২, রোপা আমন ১১, হলুদ ১০২, পেঁপে ২৫, পেয়ারা ১০ ও গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজতলা ৫ দশমিক ৫০ হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়েছে। 


সরেজমিনে কসবা এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত জমি পরিদর্শন করেন পবা উপজেলার আলিমগঞ্জ ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. জহুরুল হক। তিনি বলেন, উজান থেকে পদ্মার পানি বাড়ায় চরটি ডুবে যায়। এতে বিভিন্ন সবজি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষকেরা আইল উঁচু করে এবং জমি থেকে পানি সরিয়ে প্রায় ৬০ শতাংশ ফসল রক্ষা করতে পেরেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। আক্রান্ত ফসল কীভাবে পরিচর্যা করলে রক্ষা করা সম্ভব, সে বিষয়ে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। 


রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোস্তাফা কামাল হোসেন বলেন, পদ্মার আশপাশের এলাকা এবার প্লাবিত হওয়ায় ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে। কৃষকদের সহযোগিতা করা হবে।