বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

ফুলবাড়ীতে তন্ত্র-মন্ত্রের পাতা খেলা, হারিয়ে যাওয়া লোকঐতিহ্যে মাতল মানুষ

ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:২৭ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:২৭ অপরাহ্ন
ফুলবাড়ীতে তন্ত্র-মন্ত্রের পাতা খেলা, হারিয়ে যাওয়া লোকঐতিহ্যে মাতল মানুষ

গ্রামবাংলার মাটির সঙ্গে মিশে থাকা নানা লোকাচার, বিশ্বাস ও বিনোদনের অনেক আয়োজনই কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে। তবে সেই পুরোনো লোকঐতিহ্যের কিছু স্মৃতি এখনো ধরে রেখেছেন গ্রামবাংলার মানুষ। তেমনই এক ব্যতিক্রমী আয়োজন তন্ত্র-মন্ত্রের পাতা খেলা। দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে ঐতিহ্যবাহী এ খেলা ঘিরে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। খেলা দেখতে মাঠে ভিড় করেন নানা বয়সী মানুষ।


বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টায় ফুলবাড়ী গোলাম মোস্তফা স্কুল মাঠ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় এ খেলার ফাইনাল পর্ব। স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিত ও কৌতূহল জাগানো এ খেলায় লোকবিশ্বাস, তন্ত্র-মন্ত্রের আচার এবং গ্রামীণ বিনোদনের এক ভিন্নধর্মী সমন্বয় দেখা যায়।


আয়োজকদের ভাষ্য, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী তিনজন ‘তুলা রাশি’–সংক্রান্ত ব্যক্তিকে মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে ‘পাতা’ হিসেবে প্রস্তুত করা হয়। এরপর মাঠের মাঝখানে একটি কলাগাছের সঙ্গে তাঁদের হাত রেখে মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে প্রতীকীভাবে ‘বন্দি’ করা হয়। খেলা শুরু হলে অংশগ্রহণকারী তান্ত্রিক দলগুলো নিজেদের প্রচলিত তন্ত্র-মন্ত্রের আচার ও কৌশল প্রদর্শনের মাধ্যমে ‘পাতা’দের নিজেদের দলের দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করেন।


খেলার নিয়ম অনুযায়ী, যে দল তন্ত্র-মন্ত্রের প্রয়োগে যত বেশি ‘পাতা’ নিজেদের দিকে নিতে পারে, সেই দলই বিজয়ী হিসেবে বিবেচিত হয়। ব্যতিক্রমী এ খেলার বিভিন্ন পর্যায়ে দর্শকদের মধ্যেও দেখা যায় ব্যাপক কৌতূহল ও উৎসাহ।


আয়োজকেরা জানান, প্রথম দিন মোট পাঁচটি তান্ত্রিক দল এ খেলায় অংশ নেয়। প্রথম দিনের খেলায় তিনটি দল একটি করে ‘পাতা’ নিজেদের দিকে নিতে সক্ষম হওয়ায় খেলা ড্র হয়। পরে ওই তিনটি দলকে নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় ফাইনাল পর্ব।

ফাইনালে বিজয়ী দলের জন্য পুরস্কার হিসেবে রাখা হয় একটি খাসি, আর দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী দলের জন্য রয়েছে তিনটি রাজহাঁস।


খেলা দেখতে মাঠে জড়ো হন বিপুলসংখ্যক দর্শক। কেউ সরাসরি খেলা উপভোগ করেন, আবার কেউ মোবাইল ফোনে ধারণ করেন নানা মুহূর্ত। মাঠজুড়ে দর্শকদের কৌতূহল, উচ্ছ্বাস ও করতালিতে তৈরি হয় উৎসবের আবহ।


অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ফুলবাড়ী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক মো. আব্দুল কাদের। বক্তব্যে তিনি বলেন, মাদকের ভয়াবহতা থেকে যুবসমাজকে দূরে রাখতে শুধু সচেতনতা নয়, তাদের জন্য সুস্থ বিনোদন ও খেলাধুলার পরিবেশও তৈরি করতে হবে। মাঠ ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে তরুণদের সম্পৃক্ত করা গেলে তারা মাদকসহ নানা সামাজিক অপরাধ থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পারবে। এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে যুবসমাজকে মাঠমুখী করা এবং সামাজিকভাবে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়।


তিনি আরও বলেন, মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে পরিবার, সমাজ ও তরুণদের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন। যুবকদের অবসর সময়কে ইতিবাচক কাজে কাজে লাগাতে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক ও লোকজ আয়োজন নিয়মিত হওয়া দরকার। স্থানীয়দের মতে, আধুনিক বিনোদনের নানা মাধ্যমের ভিড়ে গ্রামবাংলার এমন লোকজ আয়োজন এখন অনেকটাই বিরল। তাই তন্ত্র-মন্ত্রের পাতা খেলার মতো আয়োজন শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং গ্রামীণ সমাজের পুরোনো লোকবিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি স্মারক হিসেবেও মানুষের আগ্রহ তৈরি করে।


বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মো. হুমায়ুন কবির কনক, দেলোয়ার হোসেন লিটন, মো. ওয়াহিদ সাদেক পাপন, মো. মুর্শেদ সরকার মুকুল, মো. আরাফাত ও মো. শরিফুল ইসলাম বিপ্লব।


অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে ফুলবাড়ী পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ড মাদক নির্মূল কমিটি। আয়োজকদের আমন্ত্রণে স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এ আয়োজনে অংশ নেন।


আয়োজকদের এমন উদ্যোগকে স্থানীয়রা ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তাঁদের মতে, যুবসমাজকে মাদকের অন্ধকার থেকে দূরে রাখতে মাঠে খেলাধুলা, সুস্থ বিনোদন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যচর্চার সুযোগ বাড়ানো জরুরি। লোকজ ঐতিহ্যকে ঘিরে এমন আয়োজন নতুন প্রজন্মকে যেমন শেকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে, তেমনি তাদের ইতিবাচক সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সম্পৃক্ত করতে পারে।