খরচ বেড়েছে পণ্য পরিবহনের, লোকসানে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা
গেল মাসের ২১ সেপ্টেম্বর জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে ২০ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। আর এতেই কৃষক, পাইকারী ব্যবসায়ী ও পরিবহন শ্রমিকরা লোকসান গুনতে শুরু করেছেন। তেলের দাম বাড়ায় বেড়েছে পণ্য পরিবহন খরচ। এতে একদিকে যেমন পাইকারি ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে আড়তে ক্রেতা ব্যাপারি না থাকায় উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না প্রান্তিক কৃষকরা। পরিবহন খাতের ব্যয় বাড়ায় যাত্রী ও চালকদের মধ্যেও ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
সবশেষ ২১ সেপ্টেম্বর ডিজেল ১১৫ টাকা থেকে ২০ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে ২০ টাকা বেড়ে ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে ২০ টাকা বেড়ে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর গত সাত মাসে মোট তিন দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। গত ১৯ এপ্রিল প্রথম দফায় ডিজেল ১০০ টাকা থেকে ১৫ টাকা বেড়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৮ টাকা বেড়ে ১৩০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে ১৯ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকা থেকে ২০ টাকা বেড়ে ১৪০ টাকা করা হয়। পরে ১ জুন দ্বিতীয় দফায় ডিজেল ১১৫ টাকায় অপরিবর্তিত থাকলেও কেরোসিন ১৩০ টাকা থেকে ৫ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা থেকে ৫ টাকা বেড়ে ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪০ টাকা থেকে ৫ টাকা বেড়ে ১৪৫ টাকা করা হয়।
রাজশাহীর বানেশ্বর বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী রায়হান চৌধুরী বলেন, বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা খুব বেশি ভালো না, খরচটা অনেক বেশি। আগে যেটা পাঠাতে কেজিপ্রতি ৫ টাকা খরচ হতো এখন তা ৭ টাকা হয়ে গেছে। লেবার খরচ বেশি, সবই বেশি। আগে যে গাড়িগুলো রাজশাহী থেকে ঢাকার ভাড়া ২০ হাজার টাকা ছিল, তা এখন ২৫ হাজার হয়েছে। তেলের দাম বাড়ার কারণেই মূলত এটা হচ্ছে। এতে পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে, ফলে লোকসানের সম্ভাবনাটাই বেশি থাকছে।
বানেশ্বর বাজারের আড়তদার রমজান আলী বলেন, বাজারে ব্যাপারি নেই, অথচ তাদের নিয়েই তাদের মূল ব্যবসা। বাইরের বেপারী এসে যখন দুটি মাল কেনে, তখন আড়তদারেরা কিছু টাকা পান এবং কৃষকও কিছু দাম পায়। বর্তমানে ব্যাপারি কম কিন্তু পণ্যের আমদানি বেশি, তাই মালের দাম কৃষকও পাচ্ছেন না এবং তাদের ব্যবসাও হচ্ছে না। জ্বালানি তেলের কারণেই মূলত গাড়ি ঠিকঠাক পাওয়া যাচ্ছে না। গাড়ি ভাড়াও বেশি, এজন্যই ব্যাপারিরা অনেকে ব্যবসা বন্ধ করে রাখছেন।
দুর্গাপুর উপজেলার কিশোরপুর গ্রামের কৃষক জালাল উদ্দিন বলেন, জ্বালানি তেলের কারণে সাধারণ কৃষক হিসেবে তারা চরম ভোগান্তিতে দিন পার হচ্ছে। পটল, শসাসহ যেকোনো সবজি নিয়ে আসলেও ন্যায্য দাম পাওয়া যাচ্ছে না। দাম না পাওয়ার কারণেই তারা ভোগান্তিতে আছেন, একটু দাম বেশি হলে তাদের জন্য স্বস্তি হতো।
সম্প্রতি জ্বালানি তেলের আকস্মিক ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সরাসরি এসে পড়েছে পরিবহন খাতে। ডিজেল ও পেট্রোলের দাম বাড়ায় একলাফে বাস, ট্রাক ও দূরপাল্লার যানবাহনের ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে, যার মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রী ও পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের। এই বর্ধিত ভাড়া নিয়ে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে তীব্র ক্ষোভ।
একতা ট্রান্সপোর্টের বুকিং সহকারি গোলাম মোর্তুজা বলেন, রাজশাহী থেকে ঢাকার ভাড়া আগে ৭১০ টাকা। তা বৃদ্ধি হয়েছে ৭৯০ টাকা। কিন্তু বিআরটিএর ভাড়া তালিকা অনুযায়ী আমাদের ভাড়া হয় ৮৫৫ টাকা। কিন্তু তা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই ৭৯০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এ কারণে যাত্রীরাও আমাদের উপরে খেপছে। তাদের বোঝানো হচ্ছে।
রাজশাহী-রংপুর চলাচলকারী একটি বাসের সুপারভাইজার জীবন আলী বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে ভাড়া একটু বেশি হয়েছে। এই বেশি ভাড়ার কারণে যাত্রীদের সঙ্গে, বিশেষ করে লোকাল যাত্রীদের সঙ্গে ঝামেলা হচ্ছে এবং তারা তা মানছে না। যেমন নাটোর থেকে রাজশাহীতে ভাড়া ১০০ টাকা হলেও অনেকে ৭০-৮০ টাকা দিয়ে গণ্ডগোল লাগিয়ে দিচ্ছে। কিছু বলাও যাচ্ছে না এবং নানান কষ্টের সম্মুখীন হতে হচ্ছে, বহু সময় মানুষের সঙ্গে গণ্ডগোলও হচ্ছে।
ট্রাকচালক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আগের তুলনায় ভাড়া এবং তেলের দাম যেভাবে বেড়েছে, সেই তুলনায় পর্যাপ্ত ভাড়া তারা বাড়াতে পারেননি বা বাড়েনি। আগে রাজশাহী থেকে চট্টগ্রাম বা চট্টগ্রাম থেকে রাজশাহীর ভাড়া নেওয়া হতো ৩০ হাজার টাকা। কিন্তু এখন সে ভাড়া ৪০ হাজারেও পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু রাস্তার খরচও বেড়েছে। ঘুরে এসেও আমাদের যে বেতন আগেও যা ছিল এখনও তাই আছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য ও অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. মো. ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, জ্বালানি তেলের দাম খুবই আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কেউ তা প্রত্যাশা করেনি। যদিও সরকারের ওপরে বিপুল পরিমাণে ভর্তুকি দেওয়ার চাপ ছিল এবং সরকারের অনেক লোকসান হচ্ছিল, কিন্তু এত দ্রুত এবং এত বেশি পরিমাণে বাড়াবে তা কারো প্রত্যাশায় ছিল না।
ফরিদ উদ্দিন খানের ভাষ্য, দ্রব্যমূল্যের দাম সামগ্রিকভাবে অনেক বেশি এবং জুন মাসে মূল্যস্ফীতি ৯.৪৬ শতাংশে পৌঁছেছিল, যা অনেকটাই বেশি। এরকম পরিস্থিতিতে মানুষ নিজেরাই কুলে উঠতে পারছিল না এবং জীবিকার ওপর বড় প্রভাব পড়ছিল, যার ওপর আবার জ্বালানির দাম বৃদ্ধি মানুষকে বড় ধরনের আশঙ্কার মধ্যে ফেলেছে। জ্বালানি এমন একটি উপাদান যার বহুমুখী প্রভাব রয়েছে এবং এটি প্রতিটি জিনিসকেই প্রভাবিত করবে, যা দিনশেষে মূল্যস্ফীতিকে আরও একধাপ পুশ দেওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রাখে।
ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, ক্ষুদ্র কৃষকদের ডিজেলের ওপর ভর্তুকি দেওয়া এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের মোটরসাইকেলের ডিজেল বা জ্বালানির ওপর ভর্তুকি দিয়ে নানাভাবে সাপোর্ট করা যায়। এই সাপোর্ট না করা গেলে দিনশেষে এই শ্রেণিটার ওপরই সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে, কারণ তাদের আয় বাড়ছে না বরং কমে যাচ্ছে এবং ইনফ্লেশনের কারণে ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। তাই সরকারের অবশ্যই পাশে দাঁড়ানো উচিত এবং ভর্তুকি কমানোর ফলে সরকারের যে অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে, তার একটি অংশ দরিদ্র বা নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীকে কোনো না কোনোভাবে আয় প্রোটেকশন হিসেবে দিলে এর প্রভাব কিছুটা হলেও মিনিমাইজ করা সম্ভব।