পত্নীতলায় ৬ মাস ধরে পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী সংকট, সেবা বঞ্চিত হাজারো মানুষ
নওগাঁর পত্নীতলায় দীর্ঘদিন ধরে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সামগ্রী সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে। উপজেলা সদর পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে প্রায় ছয় মাস এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের কেন্দ্রগুলোতে প্রায় এক বছর ধরে সরবরাহ বন্ধ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এতে ব্যাহত হচ্ছে পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজননস্বাস্থ্যসেবা। সরকারি কেন্দ্র থেকে প্রয়োজনীয় সামগ্রী না পেয়ে বিপাকে পড়ছেন নিম্নআয়ের মানুষ।
সংশ্লিষ্ট অফিস সূত্রে জানা যায়, পত্নীতলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পাশাপাশি মধইল বাজার ও খিরশীন মোড়ে রয়েছে ১০ শয্যার দুটি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য রয়েছে আটটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং ১১টি ইউনিয়নে ৩১টি কমিউনিটি ক্লিনিক। এসব কেন্দ্রে নিয়মিত সেবা নেন বিপুলসংখ্যক মানুষ।
তবে দীর্ঘদিন ধরে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের প্রায় ২৬ ধরনের ওষুধ ও সামগ্রীর সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে। কনডম, পিল, ইমপ্লান্ট, আয়রন, ক্যালসিয়াম ও ফলিক অ্যাসিডের মতো প্রয়োজনীয় সামগ্রীও মিলছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের নারী, গর্ভবতী মা ও কিশোরীরা প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সরেজমিনে বিভিন্ন ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, সেবাকেন্দ্রগুলো খোলা থাকলেও প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সামগ্রী না থাকায় অনেক সেবাগ্রহীতাকে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে বেসরকারি ফার্মেসি থেকে এসব সামগ্রী কিনছেন। এতে অতিরিক্ত খরচের বোঝা পড়ছে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর ওপর।
উপজেলা সদর পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে সেবা নিতে আসা সাদিয়া আক্তার বলেন, ‘ওষুধ না থাকায় বাধ্য হয়ে ফার্মেসি থেকে কিনতে হচ্ছে। আগে সরকারি ব্যবস্থায় বিনামূল্যে পেতাম। এখন নিয়মিত কিনতে গিয়ে খরচ বেড়ে গেছে। আমাদের মতো গরিব মানুষের পক্ষে সব সময় কেনা সম্ভব নয়।’
ঘোষনগর ইউনিয়নের উত্তর দুর্গাপুর গ্রামের কৃষক তরিকুল ইসলাম শাওন বলেন, ‘স্ত্রীর জন্য পিল ও ক্যালসিয়াম নিতে এসে ফিরে যেতে হয়েছে। পরে ফার্মেসি থেকে কিনেছি। সব সময় কিনে ব্যবহার করা সম্ভব নয়। তাই সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওপরই নির্ভর করি।’
নজিপুর ইউনিয়নের দোচাই কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) আখতারুজ্জামান জুয়েল বলেন, ‘আমরা রোগীদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি। কিন্তু ওষুধ না পেয়ে অনেকে বিরক্ত ও হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন।’
পত্নীতলা উপজেলা সদর পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের পরিদর্শিকা মোছা. মুক্তা পারভিন বলেন, ‘প্রায় ছয় মাস ধরে ওষুধের সরবরাহ নেই। আগে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ জন রোগী আসতেন। এখন ২৫ থেকে ৩০ জন আসেন। ওষুধ না থাকায় রোগীর উপস্থিতিও কমে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সেবাগ্রহীতাদের জন্য আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করছি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পরিবার পরিকল্পনার ওষুধ ও বিভিন্ন সামগ্রী না থাকায় আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি। সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে একাধিকবার জানানো হয়েছে। তারপরও এখন পর্যন্ত কার্যকর সমাধান হয়নি।’
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রীর সরবরাহ বন্ধ থাকলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তারা দ্রুত প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সামগ্রী সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
পত্নীতলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এস এম গোলাম কায়ছার সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘আগামী এক মাসের মধ্যে সংকটের সমাধান হবে বলে আমরা আশাবাদী।’ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, পরিবার পরিকল্পনা-সংক্রান্ত ওষুধ ও সামগ্রী সরবরাহে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কাজ করছে।