চারঘাটে জরাজীর্ণ ঘর ও মাদকের দাপটে বিপর্যস্ত আশ্রয়ণ প্রকল্প
নির্মাণের পর পেরিয়ে গেছে এক যুগেরও বেশি সময়। কিন্তু সংস্কারের উদ্যোগ নেই। কোথাও টিনের চাল ফুটো, কোথাও ভেঙে গেছে দরজা-জানালা। সামান্য বৃষ্টিতেই ঘরের ভেতর পানি পড়ে। কোনো কোনো ঘরের চাল থেকে টিনও খুলে গেছে। কোথাও আবার চলাচলের জন্য নেই সরকারি রাস্তা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাদকের দাপট ও বহিরাগতদের আনাগোনা। এতে নারী ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার বিভিন্ন সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। কেউ ঘর ছেড়ে চলে গেছেন, আবার যাদের যাওয়ার জায়গা নেই, তারা বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেই বসবাস করছেন। পাশাপাশি খালি হয়ে যাওয়া কিছু ঘর নিয়ে বেচাকেনা ও দখলের অভিযোগও উঠেছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চারঘাট পৌরসভা ও ছয়টি ইউনিয়নে কাঁচা-পাকা মিলিয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রায় ৮৫০টি ঘর রয়েছে। এর মধ্যে হলিদাগাছী-১ ও হলিদাগাছী-২ আবাসনে রয়েছে সবচেয়ে বেশি ঘর। ২০০৪ সালে হলিদাগাছী-১ আবাসনে ১৪০টি এবং ২০০৯ সালে হলিদাগাছী-২ আবাসনে ২৮০টি ঘর নির্মাণ করা হয়।
সরেজমিন হলিদাগাছী-১ ও ২ আবাসনে দেখা যায়, বিভিন্ন স্থানে ঝোপ-জঙ্গল গজিয়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় অনেক ঘরের টিন ও দেয়াল নষ্ট হয়ে গেছে। দরজা-জানালার অবস্থাও জরাজীর্ণ। কোথাও টিন ফুটো হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি ঘরের ভেতর পড়ছে।
হলিদাগাছী-১ আবাসনের বাসিন্দা মুকলেব আলী বলেন, ‘২০০৪ সালে তৈরি করা ঘর আর কতদিন চলবে। টিনের গোঁজা দিয়ে পানি বন্ধ করার চেষ্টা করি। জোরে বৃষ্টি হলে সব ভিজে যায়। যাওয়ার কোনো জায়গা নেই বলে বৃষ্টির পানি মাথায় নিয়েই এখানে থাকি।’
আবাসনের সভাপতি আব্দুল মান্নান বলেন, ১৪০টি ঘরের প্রায় সবকটিতেই বৃষ্টির পানি পড়ে। সংস্কারের জন্য বারবার আবেদন করেও কোনো কাজ হয়নি। এরই মধ্যে ৩৫টি পরিবার ঘর ছেড়ে চলে গেছে।
হলিদাগাছী-২ আবাসনের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় অধিকাংশ ঘরের টিন নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক শৌচাগার ব্যবহারের অনুপযোগী। আবাসনের রাস্তাগুলোও ঝোপ-জঙ্গলে ভরে গেছে।
আবাসনের সভাপতি জলি বেগম জানান, ২৮০টি ঘরের মধ্যে ৪৫টি ঘরে এখন কেউ থাকেন না। দুই দফা অগ্নিকাণ্ডে কিছু ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সেগুলো মেরামত করা হয়নি। সব মিলিয়ে প্রায় ১২০টি ঘর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সামর্থ্যবানরা নিজেদের খরচে কিছু ঘর মেরামত করলেও অধিকাংশ পরিবারের সে সামর্থ্য নেই।
সংস্কারের অভাব ও কিছু ঘর খালি হয়ে যাওয়ার সুযোগে বরাদ্দ ও দখল নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে। হলিদাগাছী-২ আবাসনের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম স্বপনের বিরুদ্ধে ঘর বিক্রি ও ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন বাসিন্দা।
বাসিন্দা শিখা খাতুনের অভিযোগ, সন্তান অসুস্থ থাকায় স্বামীকে নিয়ে কয়েক মাস ঢাকায় ছিলেন। পরে সন্তান মারা যাওয়ার পর আবাসনে ফিরে এসে জানতে পারেন, তাঁর ঘর অন্য একজনের কাছে ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। তবে ঘরের সব কাগজপত্র তাঁর নামে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
অভিযোগ অস্বীকার করে শফিকুল ইসলাম স্বপন বলেন, তিনি কারও কাছ থেকে টাকা নেননি। শিখা খাতুন ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার পর সেটি ফাঁকা ছিল। পরে একজন আবেদন করে সেখানে উঠেছেন। বিষয়টি নিয়ম অনুযায়ী সমাধান করা হবে।
আবাসন দুটির বাসিন্দাদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ মাদক নিয়ে। তাঁদের দাবি, নিয়মিত বহিরাগত মাদকসেবীদের আনাগোনা রয়েছে। এতে নারী ও শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক চলাফেরা ব্যাহত হচ্ছে। বাড়ছে চুরি, ছিনতাই ও বিভিন্ন ধরনের দ্বন্দ্ব।
আবাসনের নেতাদের করা লিখিত অভিযোগে হলিদাগাছী-২-এর ১৭ নম্বর ব্যারাকের ১০ নম্বর ঘরের বাসিন্দা মোহাম্মদ মিঠু ও তাঁর স্ত্রী আশা বেগম এবং ৮ নম্বর ব্যারাকের বাসিন্দা জিনারুলের বিরুদ্ধে মাদক কারবারের অভিযোগ করা হয়েছে। গত ছয় মাসে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে পাঁচবার লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তাঁরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, মিঠু ও তাঁর স্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত। মিঠুর বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলাও রয়েছে। বহিরাগতরা আবাসনে এসে মাদক সেবন করে এবং প্রতিবাদ করলে বাসিন্দাদের হেনস্তা করা হয়। তাঁদের দাবি, এ কারণে প্রায় ২০টি পরিবার আবাসন ছেড়ে চলে গেছে।
বাসিন্দা ফারজিনা বেগম বলেন, ‘মেয়েরা ঘরের বাইরে বের হতে পারে না। বহিরাগত মাদকসেবীরা এসে নানা কথা বলে। বাসিন্দাদের বিভিন্ন জিনিস চুরি করে বিক্রি করে মাদক সেবন করছে।’
তবে মাদক ব্যবসার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মোহাম্মদ মিঠু। তিনি বলেন, ‘এগুলো আমার নামে অপপ্রচার। আমি মাদক বিক্রি করি না। আবাসনের কার কাছ থেকে মাদক নেয় সেবনকারীরা, তা আমার জানা নেই।’
উপজেলার হুজারপাড়া ও নিমপাড়া আবাসনে টিউবওয়েল ও শৌচাগারের সংকটের পাশাপাশি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে চলাচলের রাস্তা।
বাসিন্দারা জানান, আবাসন থেকে সরকারি সড়কে যেতে হলে স্থানীয় মানুষের জমির ওপর দিয়ে চলাচল করতে হয়। এ নিয়ে জমির মালিকদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে বিরোধও হয়। এতে তাঁদের স্বাভাবিক চলাচলের পাশাপাশি জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
হুজারপাড়া আবাসনের বাসিন্দা উজ্জ্বল বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা সবাই গরিব মানুষ। ভ্যান চালানোসহ নানা ছোটখাটো কাজ করি। কিন্তু রাস্তা নেই। ভ্যান বাড়িতে আনব কীভাবে, চার্জ দেব কোথায়? ঘর বরাদ্দের সময় বলা হয়েছিল এক মাসের মধ্যে রাস্তা নির্মাণ করা হবে। কিন্তু সেই রাস্তা আর হয়নি।’
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. ফরহাদ লতিফ বলেন, আবাসনের ঘরগুলো সরকার থেকে হস্তান্তরের পর সেগুলো উপকারভোগীদের নিজেদের ঘর হয়ে যায়। ফলে ঘরের কোনো ত্রুটি হলে তাঁদেরই মেরামত করতে হবে। এ বিষয়ে তাঁদের কার্যালয়ে কোনো বরাদ্দ নেই।
চারঘাট মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহাবুবুর রহমান বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে। আবাসনগুলোতেও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে এবং নিয়মিত টহল দেওয়া হচ্ছে। মাদকের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, অগ্নিকাণ্ডে কয়েকটি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি আবাসন পরিদর্শন করে সমস্যাগুলো সম্পর্কে অবগত হয়েছেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের নিরাপদ বাসস্থান নিশ্চিত করাই সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য। কিন্তু চারঘাটের কয়েকটি আবাসনে দীর্ঘদিনের সংস্কারহীনতা, রাস্তার সংকট ও মাদকের অভিযোগে সেই নিরাপদ পরিবেশই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বাসিন্দাদের দাবি, শুধু ঘর বরাদ্দ দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়; ঘরগুলো বসবাসযোগ্য রাখা, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করাও জরুরি।