শীত এলেই চলনবিলে বাড়ে পাখি শিকার, হুমকিতে জীববৈচিত্র্য
শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে ওঠে নাটোরের চলনবিল। বিল, জলাশয়, নদী ও ফসলের মাঠে জড়ো হয় দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির পাখি। তবে অতিথি ও দেশীয় পাখির এই আগমনকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে ওঠে একশ্রেণির শিকারি। ফাঁদ, জাল, বিষটোপ ও এয়ারগান ব্যবহার করে নির্বিচারে পাখি শিকার এবং পরে সেগুলো হাট-বাজার ও খাবারের দোকানে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে একদিকে কমছে পাখির সংখ্যা, অন্যদিকে হুমকিতে পড়ছে চলনবিলের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলনবিল অধ্যুষিত সিংড়া ও গুরুদাসপুর ছাড়াও নলডাঙ্গার হালতিবিল এবং লালপুরের পদ্মার চরাঞ্চলে শীতের শুরুতেই পাখি শিকারের তৎপরতা বাড়ে। ধানক্ষেত ও জলাশয়ের পাশে লতাপাতা দিয়ে বিশেষ ফাঁদ তৈরি করে সেখানে একটি পাখি আটকে রাখা হয়। ওই পাখির ডাক শুনে অন্য পাখি কাছে এলে জালে আটকে যায়। পরে এসব পাখি খাঁচায় বন্দি করে বিভিন্ন হাট-বাজারে বিক্রি করা হয়।
গত শনিবার থেকে সোমবার চলনবিল ও হালতিবিলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ধানক্ষেত ও জলাশয়ের পাশে অভিনব কৌশলে পাখি ধরার ফাঁদ তৈরি করা হয়েছে। একটি পাখির পা চিকন সুতা দিয়ে বেঁধে বাঁশের লম্বা কঞ্চির সাহায্যে গাছের মগডালে রাখা হয়। সেটি ডাকাডাকি ও ডানা ঝাপটালে আশপাশের পাখি আকৃষ্ট হয়ে কাছে আসে। তখন জালে আটকা পড়ে সেগুলোও। স্থানীয়দের অভিযোগ, শিকারিরা কখনো কখনো ধরা পড়া পাখির চোখ নষ্ট করার মতো অমানবিক কাজও করে।
চলতি সপ্তাহে সিংড়া উপজেলার পাটশাঐল মৌজার ধানক্ষেতে কয়েকজন শিকারিকে বড় পাতার ফাঁদ ও টোপ হিসেবে ব্যবহৃত পাখি নিয়ে অবস্থান করতে দেখা যায়। সেখানে শিকার করা পাখি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল। শিকারি মোতালেব সেখ জানান, গত দুই-তিন বছর ধরে শখের বশে পাখি শিকার করছেন। তার দাবি, প্রতিদিন ছয়-সাতটি পাখি শিকার করে প্রায় দেড় হাজার টাকা আয় করেন।
চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনটি এ পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার বক, ৭৩৯টি ঘুঘু, ১০৫টি শামুকখোল, ২২০টি টিয়া, ১৭১টি শালিক, ৮৫টি পাতিসরালি, ৫৫টি ডাহুক, ৩৫০টি চাকলা, ৩০টি মাছরাঙাসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি উদ্ধার ও অবমুক্ত করেছে। এছাড়া পেঁচা, মদনটাক, হিমালয় গৃধিনী শকুনসহ বিরল প্রজাতির প্রাণীও উদ্ধার করা হয়েছে।
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, পাখি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায় না, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক পাখি ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসল রক্ষা করে এবং কিছু পাখি বীজ ছড়িয়ে উদ্ভিদের বংশবিস্তারে সহায়তা করে। ফলে পাখির সংখ্যা কমে গেলে এর প্রভাব পড়ে পুরো বাস্তুতন্ত্রে।
তিনি বলেন, ২০১২ সালে সংগঠনটি গঠনের পর থেকে স্থানীয় প্রশাসন ও বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের নির্দেশনায় চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় কাজ করছেন তারা। উদ্ধার করা বিরল প্রাণী রাজশাহীতে পাঠানো হয় এবং উপযোগী পাখি উদ্ধার করে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করা হয়।
চলনবিলে পাখি শিকার বন্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও অভিযান চালানো হচ্ছে। সিংড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিশাত আনজুম বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী পাখি হত্যা দণ্ডনীয় অপরাধ। অভিযোগ পেলে প্রশাসন নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। গত শনিবার চলনবিল এলাকায় তিন পাখি শিকারিকে একদিন করে কারাদণ্ড ও প্রত্যেককে ২ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এ সময় অর্ধশতাধিক বক অবমুক্ত এবং পাখি শিকারের ১০টি কিল্লাঘরের ফাঁদ ধ্বংস করা হয়।
রাজশাহী বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর কবীর বলেন, ফাঁদ পেতে পাখি শিকার সম্পূর্ণ অবৈধ। পাখি শিকার বন্ধে নিয়মিত টহল, অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে শিকারিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
নাটোর পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, পাখি শিকার বন্ধে প্রশাসনের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পরিবেশ সংগঠন ও সাধারণ মানুষকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে শীতের অতিথি পাখির কিচিরমিচির ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে।
নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবুল হায়াত বলেন, শুধু প্রশাসনিক অভিযান চালিয়ে পাখি শিকার বন্ধ করা সম্ভব নয়; একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। জলাশয় ও পাখির আবাসস্থলে নিয়মিত নজরদারি এবং শিকারি ও পাখি বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে উপজেলা প্রশাসনগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশসচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, পাখি শিকারের অন্যতম কারণ বাজারে এর চাহিদা। তাই পাখি কেনাবেচা বন্ধে ক্রেতাদেরও সচেতন হতে হবে। কোথাও পাখি শিকার বা বিক্রি হতে দেখলে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ কিংবা বন বিভাগকে জানানো জরুরি। একই সঙ্গে চলনবিলের জলাশয় ও পাখির আবাসস্থলগুলোতে নিয়মিত নজরদারি এবং অভিযান জোরদার করা না হলে শিকারিদের তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হবে।