বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

সোনালী আলো মাদক নিরাময় কেন্দ্র উচ্ছেদ: নিরাপত্তাহীনতা ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক ০৬ অক্টোবর ২০২৬ ১০:১৬ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ০৬ অক্টোবর ২০২৬ ১০:১৬ অপরাহ্ন
সোনালী আলো মাদক নিরাময় কেন্দ্র উচ্ছেদ: নিরাপত্তাহীনতা ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি

রাজশাহীর পবা উপজেলার সোনালী আলো বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র উচ্ছেদ, পরবর্তী পুলিশি তদন্ত, সাক্ষীদের হয়রানি, হত্যার হুমকি এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আক্তার। এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি।


মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) পবার নওহাটায় নিজ বাসভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি, পুলিশ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা বা অন্য কাউকে তিনি পূর্বনির্ধারিতভাবে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করছেন না। তাঁর উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হোক—এটাই তাঁর দাবি।


নাজনীন আক্তারের দাবি, গত ২৪ জুন তাঁর পরিচালিত সোনালী আলো মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র মাত্র ২৪ ঘণ্টার নোটিশে উচ্ছেদ করা হয়। এ সময় তাঁকে লাঞ্ছিত ও অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ঘটনার দিন পবা থানায় গিয়ে বিষয়টি জানালেও তাৎক্ষণিক আইনি সহায়তা পাননি। পরদিন তাঁর স্বামীর সংবাদ সম্মেলনের পর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহায়তায় পবা ও এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ সেখানে গিয়ে ২৩ জন রোগী ও কর্মীকে উদ্ধার করে।


ঘটনার দিন থানায় যাওয়ার পরও কেন প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দেওয়া হয়নি, সেটিও তদন্তের দাবি জানান তিনি।


সংবাদ সম্মেলনে নাজনীন বলেন, পরবর্তীতে তিনি সরকারের কাছে স্মারকলিপি দেন। এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারের শাহমখদুম জোনের দপ্তরে শুনানি হয় এবং সাক্ষীদের তালিকা দেওয়া হয়। তাঁর অভিযোগ, সাক্ষীদের শুনানিতে ডাকার পর নির্ধারিত সময়ের আগেই তাঁদের ফোন করে আসতে নিষেধ করা হয়। এতে সাক্ষীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করেন বলেও দাবি করেন তিনি।


পবা থানায় প্রমাণপত্র জমা দেওয়ার ক্ষেত্রেও হয়রানির অভিযোগ করেন নাজনীন। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রমাণপত্র জমা দিতে গেলেও গ্রহণপত্র দেওয়া হয়নি। পরে বিভিন্নভাবে তাঁকে ঘোরানো হয়। একপর্যায়ে নওহাটা কলেজ মোড়ে তাঁর স্বামীর কার্যালয়ে প্রমাণপত্র নেওয়া হলেও সেখানেও গ্রহণপত্র দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।


নাজনীন তাঁর স্বামী পরিচালিত সূর্যোদয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের ২০২৪ সালের একটি ঘটনার কথাও তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, ওই ঘটনায় তাঁর স্বামী ও প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশের পর ২০২৫ সালের ৩০ জুন সূর্যোদয় কেন্দ্রের লাইসেন্স বাতিল করা হয় বলে তাঁরা মনে করেন। বিষয়টি নিয়ে তাঁর স্বামী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আপিল এবং পরবর্তীতে উচ্চ আদালতে আইনি পদক্ষেপ নেন বলেও জানান তিনি।


লাইসেন্স বাতিলের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট অভিযোগ এবং পরবর্তী আইনি কার্যক্রম নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনার দাবি জানান নাজনীন।


তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সময়ে তাঁর স্বামীকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। বিএনপি নেতা হিসেবে পরিচয় দেওয়া শাহিন নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাদকবিরোধী কার্যক্রমে বাধা এবং রোগীদের আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকির অভিযোগও করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়ে নাজনীন বলেন, তিনি কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করছেন না।


এ ছাড়া কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, আইনজীবী এবং পৌরসভা ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। এসব ব্যক্তির মধ্যে কোনো যোগাযোগ বা সমন্বয় ছিল কি না, তা তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানান নাজনীন।


সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর দাবি, গত ২৭ সেপ্টেম্বর তাঁর শ্বশুরকে পবার বাগসারা এলাকায় স্থানীয় লোকজন আহত ও অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করেন। কীভাবে তিনি আহত হয়েছেন, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন বলে জানান নাজনীন। এর আগে তাঁর শ্বশুর ও শাশুড়িকে অজ্ঞাত অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়ার ঘটনাটিও তদন্তের দাবি করেন তিনি।


নাজনীন দাবি করেন, তাঁর স্বামী একসময় মাদকাসক্ত ছিলেন এবং পরবর্তীতে পুনর্বাসিত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানে কাজ করছেন। তাঁদের দাবি অনুযায়ী, প্রায় ১৪ বছরে তাঁদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাঁচ হাজারের বেশি ব্যক্তি চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন।


সংবাদ সম্মেলনে তিনি ৩০ দফা দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্যে সোনালী আলো কেন্দ্র উচ্ছেদ, সূর্যোদয় কেন্দ্রের ঘটনা, লাইসেন্স বাতিল, পুলিশি তদন্তের ভূমিকা, সাক্ষীদের হয়রানি, হত্যার হুমকি, ট্রেড লাইসেন্স না পাওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রয়েছে। তিনি পবা থানায় দেওয়া স্মারকলিপির তদন্ত বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে সরিয়ে অন্য কোনো নিরপেক্ষ কর্মকর্তা বা সংস্থার মাধ্যমে করার দাবি জানান। একই সঙ্গে তদন্ত চলাকালে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি যাতে তদন্তকে প্রভাবিত করতে না পারেন, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।


নিজের, স্বামী ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা এবং সাক্ষীদের স্বাধীনভাবে বক্তব্য দেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করারও দাবি করেন নাজনীন। প্রয়োজনে সরকারি উদ্যোগে তাঁদের বৈধভাবে দেশের বাইরে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার অনুরোধও জানান তিনি।


নাজনীন বলেন, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে মাদকবিরোধী সামাজিক কার্যক্রম, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত। ভবিষ্যতে তাঁদের বা পরিবারের কারও সঙ্গে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য ও লিখিত অভিযোগগুলো তদন্তের নথি হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।


তিনি বলেন, ‘আমরা কাউকে অপরাধী ঘোষণা করতে চাই না। আমরা কারও বিরুদ্ধে প্রতিশোধ চাই না। আমরা শুধু চাই—তদন্ত হোক, সত্য প্রকাশ হোক এবং আমরা নিরাপদে বেঁচে থাকতে পারি।’