বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

রামেবির উপাচার্যকে জোর করে পদত্যাগ করাতে বিএনপি নেতারা জড়িত?

নিজস্ব প্রতিবেদক ০৭ অক্টোবর ২০২৬ ১১:০৬ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ০৭ অক্টোবর ২০২৬ ১১:০৬ অপরাহ্ন
রামেবির উপাচার্যকে জোর করে পদত্যাগ করাতে বিএনপি নেতারা জড়িত?

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মব’ করে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোহা. জাওয়াদুল হক ও সেকশন অফিসার নাজমুল হোসাইনকে জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য হেনস্তার অভিযোগও এনেছেন। তবে পদত্যাগপত্রে সই নেওয়ার অভিযোগে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ ঘটনায় একজন গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। 


মঙ্গলবার (৬ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে নগরীর রাজপাড়া থানায় অজ্ঞাত ৫০ থেকে ৬০ জনের নাম উল্লেখ করে মামলাটি দায়ের করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকশন অফিসার ও ভিসির পিএস নাজমুল হোসাইন। এ মামলায় পুলিশ রাত দুইটার দিকে রাজপাড়া থানা বিএনপির সহসভাপতি আব্দুস সালামকে (৫৭) নগরীর প্যারামেডিক্যাল এলাকার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করেছে।


রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র উপ-পুলিশ কমিশনার গাজীউর রহমান জানান, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা, সরকারি কাজে বাধা প্রদান, ভয়ভীতি প্রদর্শন, শারীরিকভাবে লাঞ্ছনা করা, সরকারি মালামাল লুট ও অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনায় ভিসির পিএস নাজমুল হোসাইন বাদী হয়ে রাজপাড়া থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলা রেকর্ডভুক্ত হওয়ার পর পুলিশ গভীর রাতে আব্দুস সালাম নামের একজনকে গ্রেপ্তার করেছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে অন্য আসামিদের ধরতেও চেষ্টা করছে পুলিশ।


রামেবি সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে ‘রাজশাহীর আপামর ছাত্র-জনতা’ লেখা ব্যানার নিয়ে বিএনপি ও কৃষক দলের ৪০-৫০ নেতাকর্মী মিছিল করে উপাচার্যের কার্যালয়ে যান। এতে নেতৃত্ব দেন মহানগর কৃষক দলের আহ্বায়ক শরফুজ্জামান শামীম। তার সঙ্গে অন্যদের মধ্যে ছিলেন রাজপাড়া থানা বিএনপির সহসভাপতি আব্দুস সালাম, সাংগঠনিক সম্পাদক হারুনুর রশীদ। দরজায় ধাক্কা দিয়ে তারা উপাচার্য কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। উপাচার্যের টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ান আব্দুস সালাম ও হারুনুর রশীদ। এ সময় সাগর নামে এক বিএনপিকর্মী আগে থেকে লেখা পদত্যাগপত্র এনে হারুনুর রশীদের হাতে দেন। হারুন ও সালাম উপাচার্যকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন। তখন স্লোগান দেওয়া হচ্ছিল, ‘জ্বালো জ্বালো, আগুন জ্বালো’, ‘জ্বালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও, আওয়ামী লীগের আস্তানা’ এবং ‘আওয়ামী লীগের ভিসি হুঁশিয়ার, সাবধান’।


উপাচার্যের একান্ত সচিব (সেকশন অফিসার অর্থ) নাজমুল হোসাইন বলেন, তাদের হাতে অস্ত্র ছিল। অস্ত্র ঠেকিয়ে তারা আমাকে স্বাক্ষর করায়। এটা কোনো ইস্তফা নয়, অস্ত্রের মুখে এটা করেছে। এছাড়াও আমাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করেছে। 


এ বিষয়ে জানতে কৃষক দলের রাজশাহী মহানগর শাখার আহ্বায়ক শরফুজ্জামান শামীমকে একাধিকবার ফোন করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। বিএনপির সিনিয়র সভাপতি নজরুল হুদা বলেন, এটা দলীয় সিদ্ধান্ত নয়, ছাত্র-জনতার ব্যানারে স্থানীয় বিএনপি ও এলাকাবাসী করেছে। এটা ভিসির কারণেই হয়েছে। ভিসি নিয়োগ বাণিজ্য, দুর্নীতি ও অনিয়ম করেছে। ঠিকাদারি কাজ নিয়েও ঝামেলা করে। এ নিয়ে মানববন্ধন করেছিল। পরে ভিসি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছে শুনলাম। 


উপাচার্য ডা. জাওয়াদুল হক বলেন, ঠিকাদার ও রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থাকা কিছু লোক এর আগেও আমার পদত্যাগ দাবিতে মানববন্ধন করেছিল। বিভিন্ন সময় তারা আমার কাছে ঠিকাদারি কাজ চাইত। তাদের দাবি, আমি যেন জোর করে তাদের কাজ পাইয়ে দিই। মঙ্গলবার তারা হঠাৎ আমার অফিসে জোর করে ঢুকে যায়। তারা অভিযোগ করে, তাদের কাজ না দিয়ে ঢাকার ঠিকাদারকে দিয়েছি। এ সময় তারা আমাকে আওয়ামী লীগের দোসর বলে লাঞ্ছিত করে। তারা মব সৃষ্টি করে আমার মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেয়। প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে তাদের লেখা একটি পদত্যাগপত্রে জোর করে স্বাক্ষর নেয়।


উপাচার্য আরও বলেন, তারা পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নিয়ে আমাকে বের করে দিয়ে অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেয়। জোর করে এভাবে কখনও পদত্যাগ করানো যায় না। কিন্তু অফিসে যাওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই। তারা আমার একান্ত সচিব নাজমুল হোসাইনকে অবরুদ্ধ করে মানসিক ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে। অফিসের সিসি ক্যামেরার হার্ডডিস্ক, কম্পিউটারের সিপিইউ নিয়ে গেছে। এটি কোনো নিয়মতান্ত্রিক পদত্যাগ নয়, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড।


এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে অপমান, অপদস্ত, লাঞ্ছিত এবং প্রাণনাশের হুমকি প্রদান করে অবৈধভাবে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানোর প্রতিবাদে কর্মকর্তা-কর্মচারিদের একটি মানববন্ধন কর্মসূচি করেছেন।  এ ঘটনার পর থেকে ক্যাম্পাসে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। 


কর্মকর্তা-কর্মচারিরা ক্যাম্পাসে এলেও কোনো কাজ করতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার ডা. মো. মোফাখখারুল ইসলাম। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজের পরিবেশ তৈরি হয়নি। পুরো ক্যাম্পাসে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানের সাথে এমন ঘটনার পর থেকে সবাই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।


মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, মঙ্গলবার আমি ঢাকায় ছিলাম। বুধবার ভোরে রাজশাহীতে এসেছি। এ ঘটনা কারা ঘটিয়েছে তা আমরা অনুসন্ধান করছি। বিষয়টি কেন্দ্রকেও অবহিত করা হয়েছে। খুব দ্রুত আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব। 


নগর বিএনপির সভাপতি মামুনুর রশীদ বলেন, রামেবির ঘটনা দলীয় কোনো সিদ্ধান্তে হয়নি। বিএনপি মবের বিপক্ষে। এ ঘটনায় বিএনপির যেই জড়িত থাকবে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।