বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬
বগুড়া জেলায় ৭৩১ মণ্ডপে পূজার প্রস্তুতি

শৈল্পিক সাজে দুর্গা প্রতিমা তৈরীতে নির্ঘুম রাত শিল্পীদের

দীপক সরকার, বগুড়া ০৯ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৫৭ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
দীপক সরকার, বগুড়া ০৯ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৫৭ অপরাহ্ন
শৈল্পিক সাজে দুর্গা প্রতিমা তৈরীতে নির্ঘুম রাত শিল্পীদের

শরতের আকাশজুড়ে শুভ্র সাদা মেঘের খেলা আর শিউলি ফুলের সুবাস জানান দিচ্ছে— এমনই পরিবেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মতে দেবী দুর্গা মা মর্ত্যলোকে আসার সময় হয়েছে। পাপাচ্ছন্ন ধরণী থেকে অসুর বধ করে শান্তি ও কল্যাণ ফিরিয়ে দিতে আসছেন দশভূজা দেবী দুর্গা। আর এই আগমনী বার্তাকে ঘিরেই এখন উৎসবের আমেজ বইছে বগুড়ার প্রতিটি পাড়া-মহল্লা। দিনরাতের নির্ঘুম পরিশ্রমে পর রঙ-তুলির শেষ আঁচড়ের অপেক্ষা। কারিগরদের শৈল্পিকতার ছো^ঁয়ায় নিপুঁণহাতে প্রাণ ফিরে পাবে প্রতিমাগুলো।


পূজার দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই ব্যস্ততা বাড়ছে প্রতিমা শিল্পীদের। আর মাত্র কয়েকদিন পরই শুরু হবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। পূজা যতই এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে তাদেও প্রতিমা তৈরির কারিগরদের ব্যস্ততা। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কারিগরদের এখন দম ফেলার ফুরসত নেই। বাঁশের কাঠামোয় খড় ও মাটির প্রলেপ দিয়ে একে একে গড়ে উঠছে দেবী দুর্গা, সিংহ ও মহিষাসুরের প্রতিমা। রাতদিন এক করে চলছে শেষ মুহূর্তের নিখুঁত কাজ—রং-তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে প্রতিমার চোখ ও অবয়ব।


জেলার বগুড়া সদরের উত্তর চেলোপাড়া, শাজাহানপুরের আড়িয়া পালপাড়া, শেরপুরের সকাল বাজার, টাউন বারোয়ারী, রামচন্দ্রপুর ও চন্ডিজান এলাকার কারিগরদের দম ফেলার ফুরসত নেই। কাজের তুলনায় পারিশ্রমিক কম হলেও পুজার আনন্দে মনের মাধুরী মিশিয়ে প্রতিমা সাজানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে কারিগররা জানিয়েছেন।


সরেজমিনে বগুড়া শহরের চেলোপাড়া নববৃন্দাবন হরিবাসর মন্দির গিয়ে দেখা যায়, নিপূঁণ হাতে কাঁদামাটি, খড়, বাঁশ, সুতলি দিয়ে প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ হয়ে বেশ কয়েকদিন আগেই। এখন শুধু দেবী দুর্গার অনিন্দ্য সুন্দর রূপ দিতে দম ফেলার সময় নেই তাদের। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বিভিন্ন মন্ডপে শিল্পীরা প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করছেন জোরেশোরে। ব্যস্ত মৃৎশিল্পীরদের নিপুঁণ হাতের ছোঁয়ায় ফুটিয়ে তুলছেন দেবী দুর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মী, গণেশসহ নানা প্রতিমা। কোথাও কোথাও এরইমধ্যে শেষ হয়েছে রঙ তুলির কাজ। ১৬ অক্টোবর পূজা শুরু তাইতো শেষ মুহূর্তে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রতিমা শিল্পীরা।


দিন দিন প্রতিমা তৈরির উপকরণের দাম বাড়ায় কিছুটা বিপাকে পড়েছেন কারিগররা। শাজাহানপুরের আড়িয়া পালপাড়ার কারিগর গোবিন্দ পাল জানান, বাঁশ, খড়, মাটি থেকে শুরু করে রং ও সুতার দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেশি পড়ছে। গত বছর যে বাঁশ কেনা হয়েছিল ১৫০ থেকে ১৮০ টাকায়, তা এ বছর কিনতে হয়েছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। খড়ের আঁটি ৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১০ টাকা।


প্রকারভেদে প্রতিটি প্রতিমা তৈরিতে খরচ হয় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাজ করে ছোট প্রতিমার জন্য ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা এবং বড় প্রতিমার জন্য ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি পাওয়া যায়। কারিগররা জানান, বিভিন্ন উপকরণের দাম আগের তুলনায় বেড়েছে। মাটি, বাঁশ, খড় ও রঙের দাম বাড়ায় বেড়েছে উৎপাদন খরচ। ফলে পরিশ্রমের তুলনায় লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে খরচ বাড়লেও এ বছর তার কারখানায় তৈরি প্রতিমাগুলো ২০ হাজার থেকে ৫৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। এ পেশার সঙ্গে যুক্ত অনেক কারিগরকে দুর্গাপূজার মৌসুমের বাইরে জীবিকা নির্বাহের জন্য কৃষিকাজসহ অন্যান্য কাজে যুক্ত হতে হয়।


শেরপুরের টাউন বারোয়ারী পূজা মন্ডপের প্রতিমা তৈরির কারিগর চন্দন মোহন্ত বলেন, দুর্গাপূজার বোধনের মাধ্যমে শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হতে আর মাত্র ৯দিন বাকি। এবার ৫টি প্রতিমার অর্ডার পেয়েছেন। এ পুরো মাস দম ফেরানোর ও সুযোগ কম আমাদের। তবে বছরের অন্য সময় মাটির কাজ থাকে না। এ এক দেড় মাসের আয় দিয়ে পুরো বছরের সংসার চলে। তবে কারিগররা বলেন, ‘আগের মত তারা পারিশ্রমিক নেই যে কারণে আমাদের এ পেশায় থাকা কষ্টসাধ্য হয়ে গেছে।’ প্রতিমা শিল্পীরা অনেকটা আক্ষেপের সাথে বলেন, নিত্যপণ্যের সাথে খড়, মাটিসহ অন্যান্য উপকরণের দাম বাড়ায় প্রতিমা তৈরী করে খুব একটা বাড়তি লাভ হচ্ছেনা। তবে এবার ২০ হাজার টাকা থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রতিমা তৈরী করা হচ্ছে।


বগুড়া জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নির্মলেন্দুনাথ রায় নির্মল জানান, জেলায় এবার ৭৩১টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। জেলা ও উপজেলা পূজা উদযাপনের নেতৃবৃন্দ সব সময় সজাগ রয়েছে। এবার সুষ্ঠ ও সুন্দরভাবে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠান সম্পন্ন হবে বলে আশা করছি।


বগুড়া জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোতাহার হোসেন জানান, এ বছরও ৭৩১টি মন্ডপের তালিকা আমার কাছে এসেছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জেলার প্রতিটি মন্ডপের বিপরীতে এবারও ৬’শ কেজি করে সরকারি চাল বরাদ্দ প্রদান করেছে ত্রাণ  মন্ত্রনালয়।


দেবী বোধনের মধ্য দিয়ে দেবীর আগমন ধ্বনি অনুরণিত হয়েছে। ১৬ অক্টোবর শুক্রবার ষষ্ঠীতে দশভুজা দেবী দুর্গার আমন্ত্রণ ও অধিবাসনের মাধ্যমে শুরু হবে পূজার আনুষ্ঠানিকতা। উঁচু-নিচু, ধনী-গরিব ভেদাভেদ ভুলে পরবর্তী পাঁচ দিন সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ আপামর বাঙালি মেতে থাকবে দুর্গোৎসবে। আগামী ২১ অক্টোবর বুধবার দশমী তিথিতে  বিসর্জনের মাধ্যমে দেবী বিদায় নেবেন মর্ত্য থেকে।


হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস ও বাংলা পঞ্জিকা মতে, এ বছর দেবী দুর্গা দূর কৈলাশ ছেড়ে পিতৃৃগৃহ মর্ত্যধামে আগমন ঘোটকে বা ঘোড়ায় চড়ে ও কৈলাশে ফিরে যাবেন নৌকায়। আগমন ও গমনের অর্থ সমাজে বিশৃঙ্খলা ও ছত্রভঙ্গের ইঙ্গিত  দেয়। তবে সমস্ত অপশক্তির বিনাশ ঘটিয়ে শুভশক্তির বিজয় ঘটবে। সুখ-সমৃদ্ধিতে ভরে উঠবে দেশ-এমনটাই প্রত্যাশা।