বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

শিবগঞ্জে লাইনে দাঁড়িয়ে কৃষকের রাত পার, তবু মিলছে না সার

শিবগঞ্জ প্রতিনিধি ১১ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:৪২ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
শিবগঞ্জ প্রতিনিধি ১১ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:৪২ অপরাহ্ন
শিবগঞ্জে লাইনে দাঁড়িয়ে কৃষকের রাত পার, তবু মিলছে না সার

রাতভর সারের দোকানের সামনে অপেক্ষা, তবু মিলছে না ডিএপি সার। কেউ রাত দুইটা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে, কেউ আগের দিন থেকে অপেক্ষা করেও ফিরছেন খালি হাতে। বাধ্য হয়ে কেউ কেউ বাইরে থেকে প্রায় দ্বিগুণ দামে সার কিনছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে রবি মৌসুমের ফসল চাষের আগে ডিএপি সার নিয়ে এমন ভোগান্তির অভিযোগ তুলেছেন কৃষকেরা। তাঁদের দাবি, ডিলারদের যোগসাজশে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে সার বিক্রি করা হচ্ছে। তবে কৃষি বিভাগের দাবি, কোনো সারসংকট বা সিন্ডিকেট নেই; গুজবের কারণে কৃষকেরা আগাম সার মজুদ করতে গিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন।


রোববার (১১ অক্টোবর) উপজেলার মনাকষা বাজারে সার ডিলার আকবর আলীর নামে পরিচালিত গোডাউনের সামনে গিয়ে দেখা যায়, সারের জন্য অপেক্ষা করছেন বিপুলসংখ্যক কৃষক। গোডাউনটি তাঁর ভাই নজরুল ইসলামের পরিচালনায় রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। সেখানে সারের অপেক্ষায় থাকা তারাপুর গ্রামের শামীম বলেন, আগের দিন রাত থেকে রোববার দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করেও তিনি সার পাননি। এবার ২০ বিঘা জমিতে চাষ করছেন। তাঁর প্রয়োজন কমপক্ষে চার বস্তা ডিএপি সার, অথচ এখনো এক বস্তাও সংগ্রহ করতে পারেননি।


একই চিত্র দেখা গেছে পারচৌকা গ্রামের ৭০ বছর বয়সী তাহসানের ক্ষেত্রেও। অসুস্থ শরীর নিয়ে রাত দুইটা থেকে অপেক্ষা করেও সার সংগ্রহ করতে পারেননি বলে জানান তিনি। তাঁর চার বিঘা জমিতে সরিষা ও দুই বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব জমির জন্য প্রয়োজন অন্তত দুই বস্তা ডিএপি সার। ভিড়ের কারণে পরিচয়পত্র জমা দিতেও সমস্যায় পড়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।


সাহাপাড়ার কৃষক আব্দুস সালামের অভিযোগ, ডিলার ও কৃষি বিভাগের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে বরাদ্দের একাংশ বেশি দামে বাইরে বিক্রি করা হচ্ছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আরেক কৃষক জানান, সরকারি গোডাউন থেকে সার না পেয়ে বাইরের দোকান থেকে এক বস্তা ডিএপি সার ১ হাজার ৮০০ টাকায় কিনতে হয়েছে তাঁকে।


কয়েকটি সূত্রের দাবি, সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি হচ্ছে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডিএপি সারের সরকারি দাম প্রতি বস্তা ১ হাজার ৫০ টাকা হলেও ডিলার পর্যায়ে গোপনে ১ হাজার ২০০ টাকায় এবং খুচরা বাজারে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব দামের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক যাচাই বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।


উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় ঘুরে কৃষকদের মধ্যে সার সংগ্রহ নিয়ে উদ্বেগ ও ভোগান্তির কথা জানা গেছে। রবি মৌসুমে জমি প্রস্তুত ও বীজ বপনের আগে ডিএপি সার প্রয়োগ করতে হয় বলে কৃষকদের কাছে এ সারের চাহিদা বেশি। সময়মতো সার না পেলে ফসলের আবাদ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।


তবে শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নয়ন মিয়া সারসংকট ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, রবি মৌসুমের চাহিদা বিবেচনায় পর্যাপ্ত সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সংকটের গুজবে কৃষকেরা আগাম সার মজুদ করতে গিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, আনসার ও গ্রাম পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।


কৃষি কর্মকর্তা জানান, শিবগঞ্জ উপজেলায় ২৩ জন সার ডিলার রয়েছেন। তাঁদের মাধ্যমে নিয়ম মেনে সার বিতরণ করা হচ্ছে। গোডাউন থেকে সার সরবরাহের সময় বস্তা গণনা করা হয়। ডিলারের গোডাউনে পৌঁছানোর পর আবার গণনা করা হয়। বিতরণের সময় প্রতিটি গোডাউনে এক বা দুজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার উপস্থিতিতে পুনরায় গণনা করে সার দেওয়া হয় বলেও দাবি করেন তিনি।


তিনি আরও জানান, চলতি রবি মৌসুমে উপজেলায় ডিএপি সার ৭৬০ মেট্রিক টন, এমওপি ৩০০ মেট্রিক টন, টিএসপি ২২৫ মেট্রিক টন এবং ইউরিয়া ৫০০ মেট্রিক টন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ থাকায় সারের সংকট হওয়ার কথা নয় এবং কোনো ডিলার বা গোডাউন ব্যবস্থাপক সিন্ডিকেট গড়ে তুলতে পারবেন না।


কৃষকদের অভিযোগ ও কৃষি বিভাগের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দুই ধরনের দাবি। একদিকে সার না পেয়ে রাতভর অপেক্ষা ও বেশি দামে কেনার অভিযোগ, অন্যদিকে সংকটকে গুজব বলে দাবি করছে কর্তৃপক্ষ। প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণে বরাদ্দ, মজুত, বিক্রির হিসাব এবং খুচরা বাজারের দাম যাচাই করা জরুরি। অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং কৃষকের কাছে নির্ধারিত দামে সার পৌঁছানো নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।