বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

রাজশাহীতে ৯ মাসে ৩৮ কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ১১ অক্টোবর ২০২৬ ১০:২৯ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ১১ অক্টোবর ২০২৬ ১০:২৯ অপরাহ্ন
রাজশাহীতে ৯ মাসে ৩৮ কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার

কন্যাশিশুর অধিকার, সুরক্ষা ও উন্নয়ন নিয়ে নানা স্লোগান উচ্চারিত হলেও বাস্তবে তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের ঘাটতির পাশাপাশি বাল্যবিয়ে ও নির্যাতনের মতো ঘটনা কন্যাশিশুদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে। রাজশাহীতে গত নয় মাসে ৩৮ জন কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। বিশ্ব কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষে এ চিত্র নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।


এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য—‘বাল্যবিয়ে বন্ধ করি, কন্যাশিশুর অধিকারে বিনিয়োগ করি’। তবে প্রতিপাদ্যের সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান এখনো স্পষ্ট। সংশ্লিষ্টদের মতে, কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষায় শুধু দিবস পালন ও সচেতনতামূলক প্রচার যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ, নিয়মিত নজরদারি এবং অপরাধের ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগ।


প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীতে গত নয় মাসে নির্যাতনের শিকার কন্যাশিশুদের মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা পাঁচটি, গণধর্ষণ তিনটি, ধর্ষণচেষ্টা তিনটি, যৌন নির্যাতন চারটি, হত্যাচেষ্টা দুটি, আত্মহত্যা সাতটি, আত্মহত্যার চেষ্টা তিনটি, নিখোঁজের ঘটনা দুটি, নির্যাতন চারটি, হত্যা তিনটি এবং ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা দুটি। এসব ঘটনার প্রতিটিই কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, অল্প বয়সে বিয়ে কন্যাশিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক বিকাশের পথে বড় বাধা। বাল্যবিয়ে বন্ধে প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি মেয়েদের শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখার জন্য সরকারের সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি প্রয়োজন। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে কন্যাশিশু ও তাদের পরিবারের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে এর সুফল সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।


মাঠপর্যায়ে এখনো ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। অভিযোগ রয়েছে, বিয়ের আয়োজন করতে গিয়ে কোনো কোনো অভিভাবক বয়স বাড়িয়ে জন্মনিবন্ধন করানোর চেষ্টা করেন। এ ক্ষেত্রে অনিয়মের মাধ্যমে বয়স পরিবর্তন এবং সংশ্লিষ্টদের অর্থ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পরে এসব নথি ব্যবহার করে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি হলে বাল্যবিয়ে শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।


বাল্যবিয়ের খবর পেলে উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে তা বন্ধে উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে বিয়ে বন্ধ হলেও পরে গোপনে আবার বিয়ের আয়োজন করা হয়। ফলে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে শুধু তাৎক্ষণিক অভিযান নয়, ধারাবাহিক নজরদারি ও সামাজিক সচেতনতাও জরুরি।


বাল্যবিয়ের পাশাপাশি কন্যাশিশুর প্রতি যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ ও সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগজনক। এসব অপরাধ প্রতিরোধে অভিযোগ গ্রহণ, দ্রুত তদন্ত, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা এবং অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজে শিশুদের নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।


লফসের নির্বাহী পরিচালক শাহানাজ পারভীন বলেন, ‘বাল্যবিয়ে বন্ধে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাপক প্রচার কার্যক্রম বাড়াতে হবে। যৌন ও প্রজনন শিক্ষাসহ মানসম্মত শিক্ষায় বেশি করে বিনিয়োগ করতে হবে।’


তিনি আরও বলেন, লিঙ্গবৈষম্য ও কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে এসে নারীর জন্য উপযুক্ত কাজ ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষায় এমন ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও নিজেদের বিকাশের সমান সুযোগ পাবে।


কন্যাশিশুর অধিকার নিশ্চিত করা কেবল একটি দিবসের অঙ্গীকার নয়; এটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নিয়মিত দায়িত্ব। তাই স্লোগানের বাইরে গিয়ে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, নির্যাতনের বিচার, মানসম্মত শিক্ষা এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগই পারে কন্যাশিশুর জন্য একটি সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে।