চারঘাটে শিক্ষক বদলিতে অনিয়মের অভিযোগ, বিপাকে শিক্ষার্থীরা
চারঘাটে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বদলিতে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থী বেশি এমন বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক সরিয়ে নেওয়ায় কোথাও শিক্ষকসংখ্যা নেমে এসেছে তিনজনে, আবার তুলনামূলক কম শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে শিক্ষক বেড়ে হয়েছে ছয়জন। এতে একদিকে পাঠদান ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে বদলির স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নীতিমালা লঙ্ঘন, জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন শিক্ষক। তবে উপজেলা শিক্ষা অফিসের দাবি, নিয়ম মেনেই বদলি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২৯ সেপ্টেম্বর চারঘাট উপজেলার অভ্যন্তরে পাঁচজন সহকারী শিক্ষককে বদলি করা হয়। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোসা. ফাতেমা খাতুন বদলি কমিটির সদস্যসচিব হিসেবে আদেশে সই করেন। এর আগে ১ সেপ্টেম্বর আন্তঃউপজেলা বদলির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আবেদন আহ্বান করা হয়। এতে প্রায় ১৫ জন শিক্ষক আবেদন করেন। তাদের মধ্যে পাঁচজনের বদলি হয়। তবে বদলির পর কয়েকটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংখ্যার ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে বলে সরেজমিনে দেখা গেছে।
উপজেলার খড়েরবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে লুৎফর নাহার নীলাকে চক ঝিকরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে খড়েরবাড়ী বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. আজিম উদ্দিন অবসরে যাওয়ায় নীলার বদলির পর সেখানে শিক্ষকসংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র তিনজনে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বদলি নীতিমালায় পাঁচজনের কম শিক্ষক থাকা বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক বদলির সুযোগ নেই। ফলে খড়েরবাড়ী বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে, লুৎফর নাহার নীলার যোগদানের আগে চক ঝিকরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক ছিলেন পাঁচজন। তার যোগদানের পর শিক্ষকসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয়জনে। বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী রয়েছে ১৫৬ জন। প্রতি ৪০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক বিবেচনা করলে সেখানে পাঁচজন শিক্ষকই যথেষ্ট বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
খড়েরবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল হামিদ বলেন, “আমরা এখন মাত্র তিনজন শিক্ষক। অফিসের কাজে আমাকে শিক্ষা অফিসে যেতে হলে তখন তিনটি ক্লাস চালু রাখার মতো শিক্ষকও থাকে না। খুব দ্রুত এই সংকট দূর করার দাবি জানাচ্ছি।”
শিক্ষকসংখ্যার অসামঞ্জস্য দেখা গেছে পুঠিমারী ও রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও। পুঠিমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে ২৬৬ জন। আগে সেখানে শিক্ষক ছিলেন আটজন। শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাত বিবেচনায় সাতজন শিক্ষক প্রয়োজন হলেও বিদ্যালয়টি থেকে নাসরিন নাহার ও মাহফুজুর রহমান নামে দুজন শিক্ষককে একসঙ্গে রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। এতে পুঠিমারীতে শিক্ষকসংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ছয়জনে।
অন্যদিকে, দুই শিক্ষক যোগ দেওয়ায় রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংখ্যা বেড়ে হয়েছে ছয়জন। বিদ্যালয়টির নথিতে শিক্ষার্থী রয়েছে ৭১ জন। তবে সরেজমিনে গিয়ে ৩০ থেকে ৩৫ জন শিক্ষার্থীর উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
পুঠিমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাফিয়া খাতুন বলেন, “আমার বিদ্যালয়ে চার বছরের শিশুদের ভর্তি কার্যক্রম চালু আছে। এখানে আটজন শিক্ষকই জরুরি ছিল। কিন্তু একসঙ্গে দুজনকে বদলি করা হয়েছে। এতে ২৬৬ জন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ যে বিদ্যালয়ে তাদের বদলি করা হয়েছে, সেখানে শিক্ষার্থী তেমন নেই।”
বদলি প্রক্রিয়ায় জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করার অভিযোগও উঠেছে। উপজেলার অনুপামপুর-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২২৫ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে ছয়জন শিক্ষক ছিলেন। সেখান থেকে শাহিন সুলতানা নামে এক শিক্ষককে নাওদাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নাওদাড়া বিদ্যালয়ে বদলির আবেদন করা অন্য পাঁচজন শিক্ষকের মধ্যে কয়েকজন চাকরিতে যোগদানের দিক থেকে শাহিন সুলতানার চেয়ে জ্যেষ্ঠ ছিলেন।
বদলির সুযোগ না পাওয়া এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ১৯৯৯ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে চাকরিতে যোগ দেওয়া জ্যেষ্ঠ শিক্ষকেরাও বদলির আবেদন করেছিলেন। তাদের বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত নবীন শিক্ষকদের বদলি করা হয়েছে। তার অভিযোগ, বদলি প্রক্রিয়ায় নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি এবং আর্থিক লেনদেনও হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
খড়েরবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক মখলেসুর রহমান বলেন, শিক্ষকদের অনেকে যোগাযোগব্যবস্থা ভালো এমন এলাকার বিদ্যালয়ে বদলি হওয়ার চেষ্টা করেন। এতে গ্রামের বিদ্যালয়গুলো শিক্ষকসংকটে পড়ে। তিনজন শিক্ষকের মধ্যে কেউ ছুটিতে থাকলে বা দাপ্তরিক কাজে বাইরে গেলে বিদ্যালয়ে পাঠদান ব্যাহত হয়। কখনো কখনো শিক্ষার্থীদের নিজেদেরই ক্লাস চালাতে হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
উপজেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের সংকট রয়েছে, সেখানে সমন্বয় করার উদ্দেশ্যেই বদলি করা হয়। কিন্তু বদলির পর কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট আরও বেড়ে গেলে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন ও অনিয়মের অভিযোগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। নীতিমালা অনুসরণ করে বদলির মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষার সংকট দূর করার দাবি জানান তিনি।
বদলিতে নীতিমালা লঙ্ঘন ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও বদলি কমিটির সদস্যসচিব মোসা. ফাতেমা খাতুন। তিনি বলেন, উপজেলা বদলি কমিটি নীতিমালা অনুযায়ী যাচাই-বাছাই করে বদলির সুপারিশ করেছে। এখানে কোনো আর্থিক লেনদেনের ঘটনা ঘটেনি। বদলির পর যেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকসংকট দেখা দিয়েছে, সেখানে নতুন যোগদানকারী শিক্ষকদের পদায়ন করা হবে।
রাজশাহী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ কে এম আনোয়ার হোসেন বলেন, বদলিতে অনিয়মের অভিযোগটি যাচাই-বাছাই করে দেখা হবে। বিদ্যালয়গুলোতে যেন শিক্ষকসংকট না থাকে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষক বদলির মূল উদ্দেশ্য বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শিক্ষকসংকটের ভারসাম্য রক্ষা করা। কিন্তু বদলির পর যদি শিক্ষার্থী বেশি এমন বিদ্যালয়ে শিক্ষক কমে যায় এবং তুলনামূলক কম শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংখ্যা বেড়ে যায়, তবে সেই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা পর্যালোচনা করা জরুরি। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, বদলির নথি যাচাই এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট করা প্রয়োজন। কারণ, বদলির সিদ্ধান্তে অনিয়ম থাকলে তার সবচেয়ে বড় মাশুল দিতে হয় শিক্ষার্থীদেরই।