ইউএনও ও আদালতের উদ্যোগে বিরোধের নিষ্পত্তি, ছেলের ঘরে ফিরলেন মুন্নি খাতুন
মাকে নিজের সঙ্গে রাখতে অস্বীকৃতি জানিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনার মুখে পড়া পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার সেই গ্রাম পুলিশ সদস্য সাগর হোসেন অবশেষে মায়ের দায়িত্ব নিতে রাজি হয়েছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও আদালতের উদ্যোগে মা-ছেলের বিরোধের নিষ্পত্তি হয়েছে। মায়ের ভরণপোষণ ও দেখাশোনার দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি নিজের ভুল স্বীকার করে মা ও দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন সাগর। ছেলের সঙ্গে ঘরে ফিরেছেন বৃদ্ধা মা মুন্নি খাতুন।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহমেদের উপস্থিতিতে তাঁর কার্যালয়ে মা-ছেলের বিরোধের সমাধান হয়। এ সময় সাগর ও তাঁর মা একে অপরকে মিষ্টিমুখ করান। উপস্থিত ছিলেন সাগরের মামা জাকির হোসেন ও খালু মাসুদ রানা।
এর আগে রোববার (১১ অক্টোবর) বিকেলে আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে সাঁথিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিসুর রহমানকে মা ও ছেলেকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন। পরে ওসি নিজের গাড়িতে করে তাঁদের পাবনা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সাঁথিয়া থানার আমলি আদালতে নিয়ে যান। সেখানে দুজনের বক্তব্য শোনার পর তাঁদের মধ্যকার বিরোধের নিষ্পত্তি হয়। আদালতে সাগর মায়ের ভরণপোষণ ও দেখাশোনার দায়িত্ব পালনে সম্মত হন এবং ভবিষ্যতে মায়ের সঙ্গে এমন আচরণ করবেন না বলে জানান।
সাগর হোসেন সাঁথিয়া উপজেলার নাগডেমরা ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামের প্রয়াত সিরাজুল ইসলামের ছেলে। তিনি নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) গ্রাম পুলিশ সদস্য হিসেবে কর্মরত।
এর আগে গত ৮ অক্টোবর মা-ছেলের দায়িত্ব ও ভরণপোষণসংক্রান্ত পারিবারিক বিরোধের শুনানি হয় ইউএনওর কার্যালয়ে। সেদিন ইউএনও সেলিম আহমেদ সাগরকে মায়ের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা বুঝিয়ে দেন। কিন্তু মাকে নিজের সঙ্গে রাখতে রাজি হননি তিনি। একপর্যায়ে ইউএনওকে উদ্দেশ করে সাগর বলেন, মাকে সঙ্গে থাকতে দিলে তিনি আত্মহত্যা করবেন। মাকে সঙ্গে রাখতে পারবেন না জানিয়ে মাসে কত টাকা দিতে হবে, তা জানতে চান তিনি। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
ছেলের কাছে ফিরে যেতে পেরে আবেগাপ্লুত মুন্নি খাতুন বলেন, “আমার ছেলে ভুল বুঝে আমাকে অনেক কথা বলেছে। এখন সে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। আমি আমার ছেলেকে চেয়েছিলাম, ছেলেকে পেয়েছি—আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। ছেলের সব ভুল আমি ক্ষমা করে দিয়েছি। দেশবাসীও আমার ছেলেকে ক্ষমা করে দেবেন। এখন আমি ছেলের বাড়িতে ফিরে এসেছি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছেলের কাছেই থাকতে চাই। মা হিসেবে এটাই আমার সবচেয়ে বড় চাওয়া।”
নিজের আচরণের জন্য অনুতপ্ত সাগর হোসেন বলেন, “মা ইউএনও স্যারের কাছে ভরণপোষণের জন্য অভিযোগ করায় আমি আবেগ, ক্ষোভ ও অভিমান থেকে অনেক কথা বলেছিলাম। মাকে টাকা দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সঙ্গে রাখতে চাইনি। আদালতে গিয়ে আমি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি। আমি অনুতপ্ত। এখন থেকে মাকে নিজের কাছে রেখে তাঁর দেখাশোনা ও ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করব। আমি আমার মা ও দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাই।”
সাঁথিয়া থানার ওসি আনিসুর রহমান বলেন, আদালতের নির্দেশে মা ও ছেলেকে গাড়িতে করে আদালতে হাজির করা হয়। বিচারক তাঁদের বক্তব্য শুনে বিরোধের সমাধান করে দেন। পরে মা ও ছেলেকে একসঙ্গে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এরপরও তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
ইউএনও সেলিম আহমেদ বলেন, তাঁর ও আদালতের উদ্যোগে মা-ছেলের বিরোধের সমাধান হয়েছে। সাগর নিজের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চেয়েছেন। এখন থেকে তাঁরা একসঙ্গে থাকবেন এবং সাগর মায়ের ভরণপোষণ করবেন বলে সম্মত হয়েছেন। মানবিক এ উদ্যোগে ভূমিকা রাখতে পেরে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং আদালত ও সাংবাদিকদের সহযোগিতার প্রশংসা করেন।