বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

গুরুদাসপুরে এক বছরে উৎপাদন কমেছে দুধ ৫ হাজার টন, মাংস ৭ হাজার টন এবং ডিম ২০০ টন

আবুল কালাম আজাদ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ০১:২৩ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
আবুল কালাম আজাদ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ০১:২৩ অপরাহ্ন
গুরুদাসপুরে এক বছরে উৎপাদন কমেছে দুধ ৫ হাজার টন, মাংস ৭ হাজার টন এবং ডিম ২০০ টন

দুধ একটি সম্পূর্ণ ও সুষম খাদ্য, যাতে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের পুষ্টি উপাদান রয়েছে। এক কাপ বা ২৫০ মিলিলিটার গরুর দুধে প্রোটিন, ফ্যাট, কার্বহাইড্রেট এবং বিভিন্ন ভিটামিন ও পাওয়া যায়।


নাটোর জেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানান ‘এলডিডিবি প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা আমাদের খামারিদের সহায়তা প্রদান করেছি। যেমন- আমরা খামারিদের প্রশিক্ষণ, দুধ দোহানোর মেশিন ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে অন্যদের ও উদ্বুদ্ধ করেছি যে এভাবে করলে ভালো হবে।’


নাটোর জেলায় বার্ষিক দুধ উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টন। খামারিদের নিরলস উদ্যোগ এবং জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তির কল্যাণে নাটোর বর্তমানে দুধ উৎপাদনে একটি উদ্বৃত্ত জেলা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। 


কিন্তু গুরুদাসপুর উপজেলায় দুর্ভাগ্যজনক ভাবে দুধ উৎপাদনের চাকা উলটা রথে ঘুরেছে। উপজেলা  প্রাণিসম্পদ অফিসের ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে ৪৫ হাজার ২১০ টন লক্ষ্যমাত্রা ধরে অর্জন  হয়েছে ৪৫ হাজার ৩৩৬ টন। অথচ গত ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে অর্জন ছিল ৫০ হাজার ৫৯ টন। অর্থাৎ ২০২৪-২০২৫ এর চেয়ে ২০২৫-২০২৬  এক বছরি প্রায় ৫ হাজার টন দুধ উৎপাদন কমে গেছে। তাছাড়া  আগের বছরের অর্জনের চেয়ে  ২০২৫-২৬ বছর ৫ হাজার টন কম লক্ষ্যমাত্রা দেখানো হয়েছে। এ ছাড়াও এক বছরে উৎপাদন কমেছে মাংস ৭ হাজার টন এবং ডিম ২০০ টন। ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে মাংস উৎপাদন ছিল ২৫ হাজার ৬৭৫ টন এবং ডিম উৎপাদন ছিল ৬০০ টন। ২০২৫-২৬ সালের রিপোর্টে এসে এক বছরেই কমে উৎপাদন দেখানো হয়েছে ১৮ হাজার ৭০২ টন মাংস এবং ডিম ৪০৫ টন ।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের  তথ্যমতে  ২০২২-২৩ অর্থবছরে উপজেলায় ৬ হাজার ২২৫ জন খামারির ১০ হাজার ৪০০ টি গাভী এবং ১০০ টি মহিষের দুধ উৎপাদন ছিল ৩৬ হাজার মেট্রিক টন, এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উপজেলায় ৬ হাজার ৭৮৫ জন খামারির ১২ হাজার ২৩০ টি গাভীর ৪৪ হাজার ৬৬৯ মেট্রিক টন  ও ১২০ টি মহিষের ২৭ মেট্রিক টন সহ মোট দুধ উৎপাদন ছিল ৪৪ হাজার ৬৯৬ মেট্রিক টন। তিন বছরে দুধ উৎপাদন বেড়েছে ১৪ হাজার ৫৯ মেট্রিক টন।খামারি বেড়েছে ১ হাজার ৪৩জন, গাভি বেড়েছে  ৪ হাজার ৪২০ এবং মহিষ বেড়েছে ৪৫ টি।


২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ৭ হাজার  ২৬৮ জন খামারির ১৪ হাজার ৮২০ টি গাভী এবং ১৪৫ টি মহিষের ৫০ হাজার ৫৯  মেট্রিক টন  দুধ উৎপাদন হয়েছে বলে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রের তথ্যে পাওয়া গেছে। উৎপাদিত দুধের বর্তমান বাজার মুল্য ৫৫ থেকে ৬০ টাকা লিটার হিসেবে এ বছরে ৩০০ কোটি টাকার উর্দ্ধ মূল্যের দুধ উৎপাদন হয়ছে ।


বিগত বছরের চেয়ে দুধ-মাংস ডিম লক্ষ্যমাত্রা ধার্য্য কম হওয়ার করণ জানতে চাইলে জোলা  ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে বলা হয়, উর্ধতন কর্তৃপক্ষ থেকে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।


উৎপাদন কম হওয়া বিষয়ে বলেন- বছর জুড়ে দফায় দফায় গোখাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি, রোগবালাইয়ের উৎপাত আর দুধের সঠিক দাম না পাওয়ায়, প্রতিকূল আবহাওয়া, গো-খাদ্যের চড়া দাম ও কাঁচা ঘাস,  ধানের খড়/ পোয়াল সংকটের কারণে অনেক খামারে দৈনিক দুধ উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। নানা সংকটে জেলার চার শতাধিক দুগ্ধ খামার। গেলো এক বছরেই বন্ধ হয়েছে শতাধিক খামার।


গুরুদাসপুর উপজেলায় নাটোরের সবচেয়ে বেশি দুধ উৎপাদন হয়। বিশেষ করে এখানকার চলনবিল অঞ্চল এবং বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান প্রাণ ডেইরির হাব (দুধ সংগ্রহ ও শীতলীকরণ কেন্দ্র) থাকার কারণে এখানে বাণিজ্যিক ডেইরি ফার্মের সংখ্যা অনেক বেশি। প্রাণ ডেইরি হাবের দুধ সংগ্রহের কেন্দ্রের (বাহাদুর পাড়া, নাজিরপুর, কুমারখালি কাছিকাটা সহ কয়েকটি) তথ্যে দেখা যায় ২/৩ বছর আগে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে ১০০০ লিটার দুধ কালেকশন হতো সেখানে বর্তমানে কমে ২০০  থকে ৮০০ লিটারে নেমে এসেছে। গো খাদ্যের দাম বৃদ্ধি এবং কাঁচা ঘাস ও ধানের খড়ের অভাবে বহু খামার বন্ধ হয়ে গেছে। আবার গাভী পালন ছেড়ে অল্প সময়ে বেশি লাভের আশায়  ষাঁড় পালনের দিকে ঝুঁকেছে অনেকেই। ফলে দুধ উৎপাদন কমে যাচ্ছে।


জেলায় বছরে তরল দুধের চাহিদা ৩ লাখ ৫০ হাজার টন হলেও উৎপাদন হয় ৩ লাখ ৬০ হাজার টনের বেশি। সবশেষ ২০২২ সালের বিবিএস এর খানা জরিপ বলছে- শহরে বসবাসকারী একজন মানুষের দৈনিক দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য গ্রহণের হার ৩৮ দশমিক ৫ মিলিলিটার। যা গ্রামের মানুষের মধ্যে ৩২ দশমিক ১ মিলিলিটার। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডে প্রতিদিন ২৫০মিলি দুধ পানের নিয়ম থাকলেও গড়ে ৫০ মিলি লিটারের বেশি দুধ পান করছেন না মানুষ।


খামারিদের দাবি, দেশে দুধের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ পূরণ হয় প্রান্তিক খামার থেকে। তাই দুগ্ধ শিল্প রক্ষায় খামারি সংখ্যা বৃদ্ধি, উন্নত জাতের গাভী সম্প্রসারণ ও প্রাণিসম্পদ সেবা প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছানোর।