সোমবার, অক্টোবর ২৬, ২০২৬

মেয়াদ শেষ, রাকসু নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা!

জয়নাল ইসলাম, রাবি ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ১০:১৪ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
জয়নাল ইসলাম, রাবি ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ১০:১৪ অপরাহ্ন
মেয়াদ শেষ, রাকসু নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা!

৩৫ বছর পর গত বছরের ১৬ অক্টোবর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। চলতি বছর ইতোমধ্যেই রাকসুর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু পরবর্তী নির্বাচন কবে হবে- তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মিত রাকসু নির্বাচন হবে-তা নিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এখন নির্বাচন হবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। 


তবে, নির্বাচনের আগে পরবর্তী নির্বাচন নিয়মিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজয়ী প্যানেল। কিন্তু বর্তমান কমিটির এক বছরের মেয়াদ শেষ হলেও পরবর্তী নির্বাচন আয়োজনের দৃশ্যমান উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো সাড়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। কবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট সিদ্ধান্ত জানাতে পারেনি প্রশাসন। এতে নির্বাচন নিয়মিত করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের জুলাইয়ে রাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। প্রথমে সেপ্টেম্বরে ভোট গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হলেও কয়েক দফা পরিবর্তনের পর ১৬ অক্টোবর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তিন যুগ পর অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে শিবির-সমর্থিত প্যানেল ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। নির্বাচনের আগে প্যানেলটির ২৪ দফা ইশতেহারে রাকসু নির্বাচন ক্যালেন্ডারভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু), হল সংসদ ও সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনে নির্বাচিতদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর (রোববার) বিকাল ৫টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে শপথ পাঠ করান বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও রাকসুর সভাপতি অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব।


রাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, নির্বাচিত নির্বাহী কমিটির মেয়াদ দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে এক বছর। তবে বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও নতুন নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন রাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সেতাউর রহমান। তিনি বলেন, ‘নতুন নির্বাচন নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এটা সম্পূর্ণ নির্ভর করে উপাচার্যের ওপর। তিনি যখন মনে করবেন, তখনই নির্বাচন হবে। আমার কাছে যেসব তথ্য বা ফাইল চাওয়া হয়েছিল, আমি সব প্রস্তুত করে দিয়ে দিয়েছি।’


নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে অধ্যাপক সেতাউর রহমান বলেন, উপাচার্য আগের নির্বাচনের পরিস্থিতি, দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় এবং নির্বাচন আয়োজনের সময় কী কী সমস্যা হয়েছিল, সেসব তথ্য চেয়ে একটি ফাইল নিয়েছেন। তিনি সেই ফাইল উপাচার্যের কাছে জমা দিয়েছেন। তবে নির্বাচন আয়োজনের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও প্রক্রিয়ায় এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে মনে করেন তিনি।


অন্যদিকে, রাকসুর বর্তমান নেতৃত্ব বলছে, পরবর্তী নির্বাচন আয়োজনের জন্য তারা প্রশাসনের কাছে নিয়মিত দাবি জানিয়ে আসছে। রাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, ‘রাকসু নির্বাচন আয়োজনের জন্য আমাদের জায়গা থেকে আমরা বারবার দাবি জানিয়ে আসছি এবং প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছি। তবে আমাদের মনে হচ্ছে, প্রশাসন দলীয় সরকারের গ্রিন সিগন্যালের অপেক্ষায় রয়েছে।’


তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের তিন মাস আগে প্রস্তুতি শুরুর কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা নির্বাচন চান কি না, তা আগের নির্বাচনেই স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, প্রশাসনের বক্তব্যের মাধ্যমে নির্বাচন আয়োজন না করার পথ তৈরি করা হচ্ছে।


রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘রাকসু আদায় করে নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। আমার ইশতেহারেও রাকসু সচল রাখার প্রতিশ্রুতি ছিল। সেই প্রতিশ্রুতি আমি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে বাস্তবায়নের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’


রাকসুর সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) সালমান সাব্বির অবশ্য জানিয়েছেন, নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে প্রশাসনিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে। তিনি বলেন, ‘পরবর্তী রাকসু যাতে ধারাবাহিকভাবে চালু থাকে, সেটি আমাদের ইশতেহারের অন্যতম অঙ্গীকার ছিল। এ লক্ষ্যে তৃতীয় অধিবেশন থেকেই উপাচার্য স্যারকে বিষয়টি জানিয়ে আসছি।’


সালমান সাব্বিরের ভাষ্য অনুযায়ী, গত মাসের ৩০ তারিখ অনুষ্ঠিত সর্বশেষ অধিবেশনে উপাচার্য রাকসুর কোষাধ্যক্ষকে নির্বাচনের তফসিল প্রণয়ন ও গঠনতন্ত্র সংস্কারের দায়িত্ব দিয়েছেন। এ দুটি বিষয়ে দ্রুত হালনাগাদ তথ্য জানাতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোষাধ্যক্ষের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার পর পরবর্তী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তফসিল ও গঠনতন্ত্র সংস্কারের বিষয়ে ঘোষণা আসবে বলে আশা করছেন তিনি।


এ বিষয়ে রাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে আমরা অবশ্যই ভাবছি। আমরা সবসময়ই চাই ছাত্র সংসদ থাকুক এবং নির্বাচন হোক। তবে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। শুধু সময় হলেই নির্বাচন করা সম্ভব নয়, সামগ্রিক পরিবেশ ও পরিস্থিতিও অনুকূলে থাকতে হয়। যখন রাকসু নির্বাচনের পরিবেশ বিশ্ববিদ্যালয়ে সৃষ্টি হবে, তখনই নির্বাচন আয়োজন করা হবে।’


এদিকে, রাকসুর নির্বাচন নিয়মিত করার দাবি জানিয়েছে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন। তাদের নেতারা বলছেন, শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক চর্চা, প্রতিনিধিত্ব এবং প্রশাসনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যোগাযোগের ক্ষেত্রে ছাত্র সংসদের ধারাবাহিকতা জরুরি।


রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক মেহেদী সজীব বলেন, ‘রাকসু ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক চর্চা অক্ষুণ্ণ রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। শিক্ষার্থীদের লিগ্যাল প্ল্যাটফর্ম বলা যায়। প্রশাসনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যে সেতুবন্ধন, সেটির জন্যও রাকসু গুরুত্বপূর্ণ। আমরা ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে চাই, রাকসু নির্বাচন অব্যাহত থাকুক।’


তিনি আরও বলেন, রাকসুর মেয়াদ শেষ হওয়ায় দ্রুত পরবর্তী নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা উচিত। প্রশাসন পরিবেশ-পরিস্থিতির কথা বললেও নির্বাচন আয়োজনে বাধা সৃষ্টি করার মতো পরিস্থিতি ক্যাম্পাসে নেই বলে মনে করেন তিনি। এ দাবিতে স্মারকলিপি দেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।


শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল মিঠু বলেন, স্বাধীন মতপ্রকাশ ও গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হিসেবে ছাত্র সংসদ নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। ক্যাম্পাসে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক সহাবস্থান জরুরি। রাকসুর নির্বাচন নিয়মিত হোক, সেটিই তাঁদের প্রত্যাশা।


সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, এবারের রাকসু শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলেও ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে ছাত্র সংসদের প্রয়োজন রয়েছে। ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরা সচেতনভাবে প্রতিনিধি নির্বাচন করলে রাকসুর মাধ্যমে ভালো কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য শিক্ষার্থীদের রাকসুর দাবিতে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।


দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাকসু নির্বাচন ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হওয়া প্রত্যাশা ধরে রাখতে দ্রুত পরবর্তী নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। তবে কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও নির্বাচনের নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় নির্বাচন নিয়মিত করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং ছাত্র সংসদের ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।