সোমবার, অক্টোবর ২৬, ২০২৬

চারঘাটে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তালা, ওষুধ নেই

সোনার দেশ ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৪৪ অপরাহ্ন সম্পাদকীয়
সোনার দেশ ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৪৪ অপরাহ্ন
চারঘাটে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তালা, ওষুধ নেই

গ্রামীণ মানুষের চিকিৎসা যাবে কোথায়?


স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রগুলোই প্রাথমিক চিকিৎসা, মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুসেবার অন্যতম ভরসা। অথচ রাজশাহীর চারঘাট উপজেলায় এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কোথাও ঝুলছে তালা, কোথাও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের অনুপস্থিতিতে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা, আবার কোথাও ছয় মাস ধরে ওষুধ সরবরাহ বন্ধ। প্রশ্ন হচ্ছে, মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার তাহলে কোথায়? সরকারি অবকাঠামো আছে, জনবল পদায়ন আছে, বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছে—কিন্তু সেবা নেই। এর চেয়ে হতাশাজনক চিত্র আর কী হতে পারে? চারঘাটের ভায়ালক্ষীপুর ও ইউসুফপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে পরপর গত দুই শনিবার তালা ঝুলতে দেখা গেছে। কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউকে পাওয়া যায়নি।


নিমপাড়া কেন্দ্রে গিয়ে পাওয়া গেছে শুধু একজন ফার্মাসিস্টকে। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন অনিয়ম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, একই ধরনের অভিযোগ একাধিক কেন্দ্রে পাওয়া গেলে তা তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে আনে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কর্মস্থলে না থাকলে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? সরকারি ছুটি কিংবা ব্যক্তিগত অসুস্থতার অজুহাতে দিনের পর দিন সেবাকেন্দ্র বন্ধ থাকতে পারে না। কোনো কর্মীর ছুটি প্রয়োজন হলে বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে রোগীদের চিকিৎসা বন্ধ না হয়। জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে জনগণই সেবা না পেলে সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।


সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, এই অব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় শিকার গ্রামের দরিদ্র মানুষ, গর্ভবতী নারী, মা ও শিশুরা। সামান্য অসুস্থতায়ও ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার দূরের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ছুটতে হচ্ছে তাদের। যাতায়াতের খরচ, সময়ের অপচয় এবং চিকিৎসার বাড়তি ব্যয় নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য বড় বোঝা। বিনা মূল্যে ওষুধ পাওয়ার কথা থাকলেও ছয় মাস ধরে সরবরাহ না থাকায় রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার উদ্দেশ্যই ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে গর্ভকালীন পরীক্ষা, প্রসব-পরবর্তী পরিচর্যা ও নবজাতকের সেবা সময়মতো না পেলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। প্রাথমিক চিকিৎসার এই সংকট অব্যাহত থাকলে সাধারণ রোগও জটিল আকার ধারণ করতে পারে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দরজায় তালা ঝুলিয়ে রেখে মানুষের কাছে উন্নত স্বাস্থ্যসেবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া অর্থহীন।


উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বন্ধ থাকা কেন্দ্রগুলোর বিষয়ে তদন্ত এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। দায়িত্বপ্রাপ্তদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়াও ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে নোটিশ পাঠানোই যেন শেষ পদক্ষেপ না হয়। তদন্তের মাধ্যমে অনুপস্থিতির প্রকৃত কারণ নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কেন্দ্রগুলো নিয়মিত খোলা রাখার নিশ্চয়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে ছয় মাসের ওষুধসংকটের কারণ খুঁজে বের করে দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করতে হবে। ডিসেম্বর থেকে ওষুধের সংকট থাকবে না—এমন আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মানুষের চিকিৎসার প্রয়োজন তো ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করবে না। ওষুধ সরবরাহের নির্দিষ্ট সময়সীমা, মজুত ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। প্রয়োজনে আকস্মিক পরিদর্শন, উপস্থিতি যাচাই এবং স্থানীয় জনগণের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা চালু করতে হবে।


চারঘাটের এই চিত্র সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের জন্য সতর্কবার্তা। স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণ, জনবল নিয়োগ কিংবা ওষুধ বরাদ্দের মধ্যেই দায়িত্ব শেষ হয় না; এসব সুবিধা মানুষের কাজে লাগছে কি না, সেটিই আসল বিবেচ্য। তাই চারঘাটের বন্ধ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো নিয়মিত চালু করা, প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা, বিনা মূল্যের ওষুধ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং দায়িত্বে অবহেলার জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সরকারি সেবাকে কর্মীদের উপস্থিতি-অনুপস্থিতির ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। গ্রামের মানুষও সমান মর্যাদায় চিকিৎসা পাওয়ার অধিকারী। সেই অধিকার নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয়, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকবে অথচ সেবা মিলবে না—এ বাস্তবতা বদলাতেই হবে।