সোমবার, অক্টোবর ২৬, ২০২৬

রহনপুরে মাদক কারবারের অভিযোগ, শান্তিপাড়া উচ্ছেদের দাবিতে একাট্টা এলাকাবাসী

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ১০:১৬ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ১০:১৬ অপরাহ্ন
রহনপুরে মাদক কারবারের অভিযোগ, শান্তিপাড়া উচ্ছেদের দাবিতে একাট্টা এলাকাবাসী

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর রেলওয়ে স্টেশনসংলগ্ন শান্তিপাড়ায় মাদক কারবার ও অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ ঘিরে ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে। এলাকাটি উচ্ছেদ, মাদক কারবারে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার এবং রেলওয়ের জমি অবৈধ দখলমুক্ত করার দাবিতে একজোট হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনের নেতারা। সম্প্রতি অভিযানে গিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার পর তাঁদের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।


স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ৪০ বছর আগে রেলওয়ের জমিতে গড়ে ওঠা এই বস্তিতে দীর্ঘদিন ধরে মাদক কেনাবেচা ও সেবনের কার্যক্রম চলছে। বাইরে থেকেও অনেকে সেখানে মাদক সেবন করতে আসেন। মাদক কারবারে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলে হামলার শিকার হতে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ অভিযান চালিয়ে কাউকে গ্রেপ্তার করলেও জামিনে বেরিয়ে এসে আবার মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছেন বলে দাবি স্থানীয়দের। এতে আশপাশের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।


সম্প্রতি শান্তিপাড়ায় অভিযান চালাতে গিয়ে ইউএনওর গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ওপর হামলার অভিযোগও উঠেছে। এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার এবং এলাকাটি উচ্ছেদের দাবিতে গত মঙ্গলবার বিকেলে রহনপুর রেলস্টেশনসংলগ্ন আমবাজার চত্বরে জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্থানীয় সংসদ সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সভা থেকে মাদক কারবার ও অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগের বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি শান্তিপাড়া উচ্ছেদের দাবি জানানো হয়।


রহনপুর আম আড়তদার সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও মাদক, ছিনতাই এবং অসামাজিক কার্যকলাপবিরোধী কমিটির গোমস্তাপুর উপজেলা আহ্বায়ক নাসির উদ্দিন বলেন, সম্প্রতি শান্তিপাড়ার লোকজন স্থানীয় বাসিন্দাদের মারধর এবং ইউএনওর গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। মামলায় ৬২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।


নাসির উদ্দিনের অভিযোগ, বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগের অভাবে মাদক কারবারে জড়িত ব্যক্তিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন। অর্থের প্রভাবেও কেউ কেউ পার পেয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, এসব কারণে দীর্ঘদিন ধরে বস্তিটি উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না।


শান্তিপাড়া উচ্ছেদের দাবির সঙ্গে রহনপুর রেলবন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়টিও যুক্ত করেছেন স্থানীয় আন্দোলনকারীরা। রহনপুর রেলবন্দর বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক নাজমুল হুদা খান রুবেল বলেন, রেলবন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়নের দাবিতে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছেন। রেলস্টেশনের আশপাশে রেলওয়ের শত শত বিঘা জমি অবৈধভাবে দখল হয়ে রয়েছে। এসব জমি দখলমুক্ত করা গেলে রেলবন্দরের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হবে।


তবে পুলিশ বলছে, এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গোমস্তাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হক বলেন, ইউএনওর গাড়িতে হামলা এবং ব্যবসায়ীদের মারধরের ঘটনায় থানায় দুটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এখন পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলছে। ওসি আরও বলেন, রেলওয়ের জমিতে গড়ে ওঠা বস্তি উচ্ছেদের বিষয়টি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারভুক্ত। কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন মনে করলে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কোনো খবর পুলিশের কাছে নেই বলেও জানান তিনি।


চাঁপাইনবাবগঞ্জ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক চৌধুরী ইমরুল হাসান বলেন, শান্তিপাড়ায় উজলেফা, রেখা, আসমা, সাজ্জাদ, আলেয়া, রোকেয়া, আয়না ও বালু সাত্তারসহ প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি মাদক কারবারে জড়িত বলে তাঁদের কাছে তথ্য রয়েছে। তাঁদের অনেককে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠিয়েছেন। স্থানীয় লোকজন ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পর তাঁদের অনেকে আত্মগোপনে গেছেন। মাদক কারবারি ও মাদকসেবীদের ধরতে অভিযান চলমান রয়েছে।


অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গোমস্তাপুর সার্কেল) মো. হাসান তারেক বলেন, মাদক যুবসমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি এ ঘটনায় ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।


বাংলাদেশ রেলওয়ের রাজশাহী অঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ২০২৪ সালে এসব বস্তি উচ্ছেদ করতে গিয়ে রেলওয়ের কর্মকর্তারা হামলার মুখে পড়েন। এ কারণে তাঁদের ফিরে আসতে হয়েছিল। বস্তি উচ্ছেদ করতে হলে জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।


দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবার ও অপরাধের অভিযোগ, সাম্প্রতিক হামলার ঘটনা এবং রেলওয়ের জমি দখলমুক্ত করার দাবির কারণে শান্তিপাড়া এখন স্থানীয় আলোচনার কেন্দ্রে। এলাকাবাসীর দাবি, শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, মাদক কারবার বন্ধ, অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা এবং রেলওয়ের জমি অবৈধ দখলমুক্ত করতে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।